রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১ । ২ কার্ত্তিক ১৪২৮
Dating App

গাজীপুরে বনের শত শত বিঘা ভূমি দখল করে গড়ে উঠেছে শিল্প প্রতিষ্টানঃ দূষিত করছে পরিবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক »

গাজীপুরে ভূমিদস্যু জবর দখলকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের দখলে শত শত বিঘা বন বিভাগের জমি।ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। গাজীপুরে বাংলাদেশ বন বিভাগের ২৭৮৮১ দশমিক ৬৯ হেক্টর জমির সবটুকুরই জবর দখল করে গড়ে উঠেছে নামি দামি শিল্প প্রতিষ্ঠান। যার ফলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে পরেছে পরিবেশ।

শুধু তাই নয়, পরিবেশ অধিদপ্তরকে বার বার এই দূষণের বিষয়ে জানানো হলেও তারও নীরব ভূমিকা পালন করছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, গাজীপুরকে নিয়েই ঢাকা বন বিভাগ গড়ে ওঠে। ২৭৮৮১ দশমিক ৬৯ হেক্টর ভূমি নিয়ে গড়ে ওঠা ঢাকা বন বিভাগে ৬টি রেঞ্জ (অঞ্চল) রয়েছে। গাজীপুর জেলার ওই ৬টি রেঞ্জ হলো ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, কাঁচিঘাটা, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, রাজেন্দ্রপুর ও ভাওয়াল রেঞ্জ। ওই সব রেঞ্জের অধীনে বিট অফিস, সাব বিট অফিস ও ক্যাম্প রয়েছে ২৬টি।

ইতোমধ্যে বন বিভাগের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। বন বিভাগের লোকজনকে উৎকোচ দিয়ে নির্মাণ করা ওইসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তদন্তের নামে সময় ক্ষেপন করছে বন বিভাগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৬টি রেঞ্জে প্রায় শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান বনের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে। জবর দখলকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেশের নামী দামী শিল্প প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। অনুসন্ধানে যে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা যায় তার মধ্যা পারামউন্ত টেক্সটাইল লিমিটেড, সোলার সিরামিক্স লিমিটেড, ইকো কটন মিলস লিমিটেড, হাউ আর ইউ লিমিটেড, জুবায়ের স্পিনিং মিল, দি সুয়েটার, ডানা গ্রুপ, সান পাওয়ার সিরামিক্স লিমিটেড, হুয়া থাই সিরামিক্স লিমিটেড, সুলতানা ডাইং, মাসুমা গার্মেন্টস লিমিটেড, জেসন এগ্রোভেট লিমিটেড, গিভেন্সি গ্রুপ, ফার সিরামিক্স লিমিটেড, গালাক্সি লিমিটেড অন্যতম।

শুধু তাই নয় এই সকল প্রতিষ্ঠান কোন প্রকার ই টি পি ব্যাবহার না করে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে, যার ফলে পরিবেশ দূষণ সাধিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এমনকি চার দলীয় জোট সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, অপরাধ জগতের গডফাদারও পিছিয়ে নেই বনের জমি দখলের কাজে।

বন বিভাগের একটি গোপন সূত্র জানায়, কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রথমে বনের জায়গার সঙ্গে লাগোয়া ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কেনে। এরপর তারের বেড়া দিয়ে রাতারাতি সীমানা বর্ধিত করে।

বনের জমি দখলের সময় কেউ অভিযোগ দিলে বনের লোকজন প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। অভিযোগের মাত্রা বেশি হলে একটি মামলাও করে বন বিভাগ। এরপর আদালতে মামলা বিচারাধীন অবস্থায় জবর-দখলকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে বনের জমি দখলের মাত্র বাড়িয়ে দেয়।

চার দলীয় জোট সরকারের একজন প্রভাবশালী এমপি রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জে ২০০ বিঘার উপরে বনের জমি দখল করে তৈরি করেছেন শিল্প প্রতিষ্ঠান। বনের জমির সাথে ওই প্রতিষ্ঠান নিরীহ গ্রামবাসীর জমিও দখল করেছেন। জাল কাগজপত্র তৈরি করে সাধারণ মানুষের জমিতে ওই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বিশাল শিল্প ইউনিট। বনের লোক এবং পুলিশকে পিটিয়ে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে দখল হয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানের শত শত বিঘা জমি।

চারদলীয় জোট ও মহাজোট সরকারের আমলে অনেক এমপি মন্ত্রীর দখলে চলে গেছে বন বিভাগের হাজার একর জমি। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাও জবর দখলে পিছিয়ে ছিলেন না।

সম্প্রতি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে ৬টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক ভাবে উৎকোচের অংক উল্লেখ করে কয়েকটি অভিযোগ করেন। ৬০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বন বিভাগকে উৎকোচ দিয়ে ওই সব প্রতিষ্ঠান বনের জমি জবর দখল করছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান বন সংরক্ষক একজন বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছেন। তদন্ত কমিটি সরেজমিন তদন্ত করে গেলেও তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি।

এ সব বিষয়ে শ্রীপুর বিটের বিট নাম প্রকাশে অনিশুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, “অভিযোগের বিষয়ে মিডিয়াকে কোনো বক্তব্য দেওয়ার ‍বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিষেধ রয়েছে। ”

এমনকি গাজীপুরের প্রধান বন সংরক্ষকের নাম্বারে বার বার ফোন করেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নাই।

এমতাবস্থায়, নির্বিঘ্নে বনের জমি জবর দখল করে শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে অচিরেই ঢাকা বন বিভাগ জমি শূন্য হয়ে পড়বে বলে সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছেন।

শেয়ার করুন »

নিজস্ব প্রতিবেদক »

মন্তব্য করুন »