২২৫ কোটির শুঁটকির বাজার

সঞ্জয় দাস লিটু, পটুয়াখালী
সাগরকন্যা কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষতিকর কোনো কেমিক্যাল মিশ্রণ ছাড়াই শুধু লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয় শুঁটকি মাছ। এখানে আসা পর্যটকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ এলাকার বিষমুক্ত শুঁটকি। গত মৌসুমে ৪৬২ মেট্রিকটন শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করেন শুঁটকি চাষিরা। যা থেকে তাদের আয় হয় ২২৫ কোটি টাকা। জানা যায়, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ও এর আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন নদীর তীরে কাঁচা মাছ কেবল রোদে শুকিয়ে উৎপাদন করা হয় শুঁটকি। শুঁটকি চাষিরা জানান, এ এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন করার নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। কয়েক বছর ধরে শীত মৌসুমে কুয়াকাটা সৈকত ও এর আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে অস্থায়ীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। ক্রেতাদের চাহিদানুযায়ী শুঁটকি সরবরাহ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, ক্ষতিকর কোনো কেমিক্যাল মিশ্রণ ছাড়াই শুধু লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে মাছ। লেবুর বন, খাজুরা পয়েন্টসহ সৈকতের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে লবণ মেখে বাঁশের মাচা বানিয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হচ্ছে শুঁটকি মাছ। এ পল্লীতে দেখা মেলে পোয়া শুঁটকি, সোনাপাতা, মধুফাইস্যা, রূপচাঁদা, শাপলাপাতা, চাপিলা, ফাইস্যা, লইট্রা, চিংড়ি, ছুড়ি, হাঙ্গর, ভোল, কোড়ালসহ অন্তত অর্ধশত প্রজাতির সুস্বাদু শুকনা মাছ। শুঁটকিপল্লীতে পছন্দের শুঁটকি সংগ্রহে ভিড় জমে পর্যটকসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদের।

যশোর থেকে আসা পর্যটক সাইফুল ইসলাম জানান, শুঁটকি আমাদের পরিবারের সবার খুবই প্রিয়। দেশের বিভিন্ন এলাকার শুঁটকি খেয়েছি। কুয়াকাটার শুঁটকির কথা শুনে এখানে এসেছি। বেশ কিছু শুঁটকি নিয়েছি। মেডিসিন ছাড়াই রোদে শুকানো হয় মাছ। তেমন কোনো গন্ধ নেই। নড়াইল থেকে আসা মো. রুবেল আহসান- রোমানা ইসলাম বলেন, বহুদিন ধরে অফিস কলিগদের কাছে কুয়াকাটার শুঁটকির কথা শুনেছি। এখানে এসে দেখলাম আসলেই প্রাকৃতিকভাবে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। লইট্টাসহ কয়েক ধরনের শুঁটকি কিনেছি। আত্মীয়স্বজনদেরও গিফট করব।

লেম্বুর বন এলাকার শুঁটকি উৎপাদনকারী হানিফ মিয়া জানান, সৈকতে প্রায় ৩০ বছর ধরে শুঁটকি মাছের ব্যবসা করছেন তিনি। প্রতি বছর বিভিন্ন কারণে স্থান পরিবর্তন করতে হয় তাদের। এর ফলে তাদের অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়। দোকানিদের চাহিদানুযায়ী মাছ শুকাতে পারছেন না। দোকানিরাও ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে পারে না। কুয়াকাটার একাধিক শুঁটকি দোকানিও একই কথা জানান।
জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় মাছ শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাত করেন চাষিরা। এসব এলাকায় শুঁটকি উৎপাদনে বা প্রক্রিয়াজাতকরণে মৎস্য অধিদফতরের চিন্তা আছে। প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলগুলোতে আমরা নিয়মিত ভিজিট করি। নিরাপদ মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন করার জন্য ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ৩৫২ শুঁটকি চাষিকে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর আগে বিভিন্ন ধরনের মাছি, পোকামাকড়ের উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য চাষিরা কিছু ওষুধ ব্যবহার করতেন। প্রশিক্ষণের পর কোনো ওষুধ ব্যবহার না করে চাষিরা শুঁটকি উৎপাদন করছে। এখানকার শুঁটকি আসলেই বিষমুক্ত এবং গন্ধ কম, সুস্বাদু ও মানসম্মত। এ অঞ্চলের চাষিরা গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৬২ মেট্রিকটন শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে। যাতে তাদের আয় হয়েছিল ২২৫ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights