চমক দেখিয়ে ছক্কা ইমরানের

প্রতিদিন ডেস্ক

জেলখানার বন্ধ প্রকোষ্ঠে বসেই পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে ছক সাজিয়েছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিটিআই দলের প্রধান ইমরান খান। আর সেই ছকেই চমক দেখিয়ে ছক্কা মেরেছেন তিনি। সেনাবাহিনীসহ তাদের পক্ষে থাকা বাঘা বাঘা নেতাদের তিনি রীতিমতো কুপোকাত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনেক ঘোট পাকানো হলেও এ পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বিরূপ পরিবেশেও ইমরানের দলের পক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হরেক রকম প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সর্বাধিক আসনে বিজয়ী হয়েছেন।

গতকাল রাতে পাওয়া পাকিস্তানি গণমাধ্যম ডন ও জিও নিউজের তথ্যানুযায়ী, ভোট হওয়া ২৬৫ আসনের মধ্যে ইমরানের পক্ষে দাঁড়ানো স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন ১০১টি আসনে। যদিও পিটিআই দাবি করেছে, তাদের প্রার্থীরা ১৭০ আসনে জয়ী হয়েছেন, কিন্তু এ ফলাফল আটকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন দল পেয়েছে ৭৩ আসন, বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি পেয়েছে ৫৪ আসন এবং বাকি ছোট দলগুলো মিলে পেয়েছে ২৮ আসন। সরকারি ফলাফলে বলা হচ্ছে, কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পায়নি। এ অবস্থায় বিভিন্ন সূত্রে খবরে বলা হচ্ছে, ইমরান খানের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও বিরোধী পক্ষ একজোট হয়েছে। এতেকরে ক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ। এর আগে ডন ও জিও নিউজের তথ্য ব্যাখ্যা করে খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের সব আসনের ফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা, আলোচনা ও বিতর্ক। কোন দল সরকার গঠন করবে সে আলোচনাই এখন তুঙ্গে। কিন্তু কোন দল আসলে কত আসনে জয়লাভ করেছে- সে হিসাবই এখন পর্যন্ত অফিশিয়ালি ঘোষণা করা হয়নি। ওই খবরে উল্লেখ করা হয়, এবারের নির্বাচনের ফল ঘোষণা করতে নজিরবিহীন সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। ৮ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও ১০ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৬৫ আসনের মধ্যে ২৫৫টির বেসরকারি ফল জানা গেছে। দেশটিতে অতীতে এমন নজির নেই। এমনকি ভোটের দিন মোবাইল ফোন সেবা ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করারও নজির এর আগে ছিল না। এ নিয়ে বেশ সমালোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক সমাজ ভোটের দিন মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করাসহ যাবতীয় অনিয়মের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ব্যারিস্টার গোহর খান দাবি করেছেন, তার দল ১৭০ আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু অনেক আসনে পিটিআই প্রার্থীকে পরাজিত দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত নিশ্চিতভাবে দাবি করছি যে, জাতীয় পরিষদের ভোট হওয়া ২৬৫ আসনের মধ্যে পিটিআই ১৭০টিতে জয়লাভ করেছে। নির্বাচন কমিশন এর মধ্যে ৯৪টি স্বীকার করছে এবং ফরম-৪৭ (অস্থায়ী ফলাফল) জারি করেছে। গোহর আরও বলেন, ২২টি আসন- যার মধ্যে ইসলামাবাদের তিনটি, সিন্ধুর চারটি এবং পাঞ্জাবের বাকি আসনগুলোতেও পিটিআই জিতেছিল। কিন্তু সেগুলোতে পিটিআই প্রার্থীদের পরাজিত দেখানো হয়েছে।

অন্যান্য গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত সবগুলো আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। ভোট হওয়া ২৬৫ আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৫৫ আসনের ফল জানা গেছে। এর মধ্যে ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয় দেখানো হয়েছে ১০০ আসনে। নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) পেয়েছে ৭৩ আসন, বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পেয়েছে ৫৪ আসন এবং অন্যান্য দল পেয়েছে ২৮টি।
আরেক খবর অনুযায়ী, ইমরান খানের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে সেনা কর্মকর্তারা ইমরানবিরোধী দল ও গোষ্ঠীগুলোকে একজোট করার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই, শুক্রবার গভীর রাতে বৈঠক করেছেন প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা। কেন্দ্র ও চারটি প্রদেশে সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সমর্থনের আশায় এ বৈঠক হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় এক বক্তব্যে পিএমএল-এন নেতা নওয়াজ শরিফ ঘোষণা করেন, তিনি তার ভাই, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে প্রধান রাজনৈতিক দল-পিপিপি, এমকিউএম-পি এবং অন্যদের সঙ্গে জোট গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। জানা যায়, এ কারণেই পিপিপি নেতা আসিফ আলি জারদারি ও তার ছেলে, বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারির সঙ্গে পাঞ্জাবের তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী মহসিন নকভির বাসভবনে শেহবাজ দেখা করেন। বড় কিছু শুরুর জন্যই এ বৈঠকটি হয়েছে উল্লেখ করে পিপিপির একটি সূত্র গণমাধ্যমকে জানায়, ভোটের ফলাফল ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি ফলপ্রসূ হয়েছে। সিনিয়র নেতা আমিনুল হক বলেন, পরে শাহবাজ এমকিউএম-পির আহ্বায়ক ডা. খালিদ মকবুল সিদ্দিকীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। শাহবাজ শরিফ সন্ধ্যায় তাকে ফোন করেন। খুব শিগগিরই আরও একটি বৈঠক করবেন এই দুজন।

এদিকে নির্বাচনের আগে, এমকিউএম-পি ঘোষণা করেছিল- নির্বাচনের পরে তারা প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নওয়াজ শরিফকে সমর্থন করবে। কিন্তু পিএমএল-এন-এর ফলাফল আশাব্যঞ্জক না হওয়ায়, হতাশ এমকিউএম-পি। খবরে বলা হয়, তারা সম্ভবত এখন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছে।

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায়- তাহলে সংরক্ষিতসহ মোট ১৭২টি আসন পেতে হবে। সে হিসাবে যদি পিটিআই এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে তাদের নির্বাচন হওয়া আসনগুলো থেকে অন্তত ১৫০টি আসনে জয় পেতে হবে। এ ছাড়া যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন; তাদের নির্বাচিত হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যে কোনো দলে যোগ দিতে হবে। নয়তো তাদের সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, পাকিস্তানে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তিন দিনেও মেলেনি ভোটের ফলাফল। এ অবস্থায় দেশটির রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী, ভোটার ও সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবার দৃষ্টি এখন টেলিভিশনের পর্দায়। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমগুলো জানায়, পাকিস্তানে সরকার গঠনের জন্য ১৩৪টিতে জয়লাভ করতে হয়। সেক্ষেত্রে কোনো দলই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। যদিও কয়েকটি আসনের ফল ঘোষণা এখনো বাকি রয়েছে। বলা হচ্ছে, সেগুলোতে জয়ী হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না কোনো দল। এমন পরিস্থিতিতে কারা সরকার গঠন করবে- তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দাবি করেছেন, সাধারণ নির্বাচনে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন। তিনি তার অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে প্রকাশিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) দ্বারা প্রস্তুতকৃত ‘বিজয় ভাষণে’ এ দাবি করেন। তিনি বলেন, ফরম ৪৫ এর তথ্য অনুসারে পিটিআই সমর্থিত প্রার্থীরা ১৭০ আসনে জয়ী হচ্ছেন। এতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে তার দল। দেশের নজিরবিহীন পাল্টা লড়াইয়ের ফলে সাধারণ নির্বাচনে তার দল বড় বিজয় পেয়েছে। পাকিস্তানের জনগণকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা ইতিহাস রচনা করেছেন। জনগণের ভোটে ‘লন্ডন পরিকল্পনা’ ব্যর্থ হয়েছে। ভোটারদের প্রশংসা করে তিনি উল্লেখ করেন, তাদের সবার ওপর তার বিশ্বাস রয়েছে। তিনি সবাইকে অভিনন্দন জানান। এদিকে বেশ কিছু গণমাধ্যম মন্তব্য করেছে যে, সেঞ্চুরি করেও ক্যাপ্টেন ইমরান আউট হচ্ছেন। সেনা সহায়তায় নওয়াজ-বিলাওয়ালের জোটকেই পাকিস্তানের ক্ষমতায় আনার চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে একে অপরের হাত মিলিয়েছে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। কারণ নওয়াজ শরিফ এবং বিলাওয়াল ভুট্টো একজোট হলেই পাক পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পাবেন তারা। এতেকরে তারা সরকার গঠন করতে পারবেন। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর আলী খান এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আশা করছি প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সরকার গঠনের জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন। কারণ, জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়েছেন। ইসলামাবাদে গতকাল গণমাধ্যমের উদ্দেশে গহর আলী আরও বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাব এবং সরকার গঠন করব।’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘কেউ জনগণের কণ্ঠ এবং কাক্সিক্ষত সরকার গঠনের উদ্যোগকে দমন করার চেষ্টা করলে অর্থনীতি তার ধাক্কা সইতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পিটিআইয়ের জন্য কোনো বাধা তৈরি করা ঠিক হবে না এবং যতটা দ্রুত সম্ভব ফল ঘোষণা করা উচিত। আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত ফল ফরম-৪৫-এ পূরণ করে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সব ফল পেয়েছি।’ গহর বলেন, ‘সব প্রক্রিয়া শেষে পিটিআই আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অন্তর্দলীয় নির্বাচনে যাবে। জনগণ পিটিআইকে বিশাল ম্যান্ডেট দিয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা সব মামলার অভিযোগ ভুয়া।’ তিনি ফল ঘোষণায় বিলম্বের প্রতিবাদে আজ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ডাক দেন।

সেনাপ্রধানের ভাষ্য : পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির অরাজকতা আর মেরুকরণের বৃত্ত থেকে দেশকে বের করে আনতে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গতকাল এক বিবৃতিতে দেশ পরিচালনার জন্য ‘যোগ্য নেতৃত্বের বিকল্প নেই’ বলে উল্লেখ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights