ভুলে যাওয়াও একটি রোগ

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী

আলঝেইমারস হলো মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত নিঃশব্দ ঘাতক রোগ। সচরাচর আলঝেইমারস ডিজিজ থেকেই ডিমেনশিয়া সবচেয়ে বেশি হয়। ১৯০৬ সালে জার্মান নিউরোলজিস্ট (ব্রেইন বিশেষজ্ঞ) অ্যালিয়স আলঝেইমারস্ সর্ব প্রথম আলঝেইমারস আবিষ্কার করেন। এটি একটি শারীরিক রোগ। আলঝেইমারস একটি অগ্রগতিশীল রোগ। অর্থাৎ সময় চলার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে আমাদের ব্রেইনের আরও অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

এবার জেনে নিন প্রধান লক্ষণগুলো : স্মৃতিশক্তি লোপ : সাময়িকভাবে স্মৃতি লোপ পায়, যা স্বাভাবিক কর্মক্ষমতার ব্যাঘাত ঘটায়। যেমন, চেনা মানুষের নাম, চেনা মুখ, পরিচিত টেলিফোন নম্বর ইত্যাদি ভুলে যাওয়া।

প্রতিদিনের কাজের বিভ্রান্তি : প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজ করতে গিয়ে করতে না পারা। যেমন : রান্না করা, বাতি জ্বালানো, টিভি চালানো এবং সাধারণ হাটবাজারের হিসাব-নিকাশ করতে না পারা ইত্যাদি।
ভাষাগত সমস্যা : এলোমেলো করে বাক্য, যা অনেক সময় বোধগম্য হয় না।

সময় ও স্থান চিহ্নিত করতে অপারগ : সময়জ্ঞান না থাকা। সকাল, বিকাল ও রাত বুঝতে না পারা। হারিয়ে যাওয়া বা রাস্তা হারিয়ে অন্যখানে চলে যাওয়া, বাড়ির রাস্তা খুঁজে না পাওয়া। রাস্তা ভুলে যাওয়া। পরিচিত জায়গায় এসেও সে জায়গা চিনতে না পারা।

বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা কমে যাওয়া : নিজের অবস্থানে থেকে কী কাজ করতে হবে তা অনেক সময় বুঝতে না পারা। যেমন : কোন অবস্থায় কী পোশাক পরবে বা কখন কোথায় রিকশায় উঠে কত ভাড়া দিতে হবে তা পুরোপুরি বুঝতে না পারা।

অন্যমনস্ক হওয়া : নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো একটা জিনিস দিয়ে কী করতে হবে তা অনেক সময়ই বুঝে উঠতে না পারা। নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র অদ্ভুত সব জায়গায় রেখে তা বেমালুম ভুলে যাওয়া।

মেজাজ ও আচার-আচরণে পরিবর্তন : এছাড়া যখন তখন মেজাজ পরিবর্তন হওয়া। খিটখিটে, রাগান্বিত হওয়া, দুর্ব্যবহার করা ইত্যাদি।

ব্যক্তিত্ববোধের পরিবর্তন : বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক, তবে ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। যেমন : অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, সন্দেহ প্রবণতা বা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং সে ক্রমেই ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলেন।

কর্মোদ্যম হারিয়ে ফেলা : বয়সের সঙ্গে ক্লান্তিবোধ আসা স্বাভাবিক।

এক্ষেত্রে যে কোনো কাজের প্রতিই আকর্ষণ কমে যায়।

কি ধরনের লোকদের হয় : ডিমেনশিয়া প্রধানত বৃদ্ধ লোকদের হয়। সাধারণত ৬৫ থেকে ৮৫ বছর বয়সের মানুষ ডিমেনশিয়ায় ভোগেন। তবে কম বয়সের লোকদেরও তা হতে পারে। পুরুষ বা মহিলা যে কারও ডিমেনশিয়া হতে পারে। বিজ্ঞানীরা ডিমেনশিয়ার সঙ্গে বংশগত সম্পর্ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন। দেখা যাচ্ছে, কিছু বিরল ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার জন্য দায়ী রোগগুলো বংশগত হতে পারে।

বংশগত গাঠনিক প্রক্রিয়ার কারণে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আলঝেইমারস অথবা ডিমেনশিয়ার প্রতিরোধ কি করা যায় : যে রোগগুলো থেকে ডিমেনশিয়া জন্মলাভ করে সেগুলো কেন হয় তা বর্তমানে আমরা নিশ্চিত করে জানি না। সুতরাং ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা বের করা বা আবিষ্কার করা কঠিন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্বাস্থ্যকর খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি ডিমেনশিয়া থেকে হয়তো রক্ষা করে। বিশেষ করে ধূমপান না করলে, নিয়মিতভাবে ব্যায়াম করলে, চর্বিযুক্ত খাবার না খেলে এবং বৃদ্ধ বয়সে মানসিকভাবে সক্রিয় থাকলে ভাসকুলার ডিমেনশিয়া এবং আলঝেইমারস ডিজিজের আশঙ্কা কম থাকে। তাই এ বিষয়ে অবহেলা না করে আমাদের সবাইকে যথেষ্ট সচেতন ও যত্নবান হতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতাল, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights