মিয়ানমার : চীন-আমেরিকা দ্বৈরথ

সামরিক ইতিহাসের শিক্ষার্থী আর নীতিনির্ধারক পর্যায়ের রাষ্ট্র এবং সেনানায়কদের জন্য একটি অবশ্য পাঠ্য ও আকর্ষণীয় বিষয় হলো বার্মা ক্যাম্পেইন তথা বার্মা অভিযান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) চলাকালে ১৯৪১ সালে শুরু হওয়া বার্মা অভিযানে আমেরিকার সমর্থনপুষ্ট চীনা ও ব্রিটিশ সৈন্যদের বার্মা ছাড়া করতে অভিযান চালায় জাপানি রাজকীয় সেনাবাহিনীর সশস্ত্র যোদ্ধারা। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুসহ ভারতীয় অনেকে ছিলেন অপরাজেয় খেতাব পাওয়া জাপানিদের পাশে। অন্যদিকে ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ভারতীয়দের অনেকেই বাধ্য হয়ে শামিল হন মিত্রশক্তির ঝান্ডার ছায়ায়। ১৯৪৬ সালের মার্চে ইমফাল যুদ্ধ এবং কোহিমা যুদ্ধ নামে বিখ্যাত ও বড় দুটি যুদ্ধে জাপানিদের পরাজয় ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন করে দেয়। এরপর কেটে গেছে আট দশক। অথচ আজও জ্বলছে সেই ভূখ-, যা বার্মার বদলে মিয়ানমার নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিত্রবাহিনীর আক্রমণে একে একে পতন ঘটে জাপানি সেনা ঘাঁটিসমূহের। ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়ায় এখনো সেসব দিনের সাদা-কালো ছবি দেখা যায়। আর আজ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রঙিন পৃষ্ঠা কিংবা রঙিন পর্দায় দেখা যায় মিয়ানমারের সরকারবিরোধীদের আক্রমণের মুখে একে একে পতন ঘটছে সরকারি সীমান্তরক্ষীদের ঘাঁটি। সেদিন চীন ও মার্কিনপন্থিরা একাট্টা হয়ে জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। কিন্তু আজ যেন ‘দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে গেছে বেঁকে।’

মিয়ানমারে রয়েছে ৭টি অঞ্চল। ইয়াঙ্গুন ছাড়া বাকি ৬টি অঞ্চল মূলত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে ৭টি রাজ্য, ১টি ইউনিয়ন টেরিটরি, ১টি স্বায়ত্তশাসিত বিভাগ ও ৫টি স্বায়ত্তশাসিত জোন নিয়ে এক অদ্ভুত ও জটিল প্রশাসনিক সমীকরণের মধ্যে রয়েছে ৭ হাজার ৫৪ বর্গকিলোমিটারের এই দেশ। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশটির অন্যতম পরিচয় একটি সেনাশাসিত ভূখ- হিসেবে। প্রাক্তন বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমারের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ইতিহাস ও দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইতিহাস পৃথক করার কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে দেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে যুগের পর যুগ ধরে প্রত্যন্ত এলাকা বা সংখ্যালঘুদের ওপর কেন্দ্র শাসিত সরকার ও সামরিক জান্তার নিষ্পেষণের এক করুণ অধ্যায়।

দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের প্রভাব ও আশীর্বাদ নিয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশটিকে শাসন করেছে। আন্তর্জাতিক কোনো চাপই দেশটির সেনা শাসকদের টলাতে পারেনি। নোবেলজয়ী রাজনীতিবিদ অং সান সু চিসহ লাখ লাখ বন্দির করুণ জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি গোটাবিশ্ব। বলা হয়, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার এমন অনড় ও দৃঢ় অবস্থানের চালিকাশক্তি চীন। সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করে ও সমর্থন দিয়ে চীন ভারত ভূখন্ডের পাশে এবং বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের তীরে নিজস্ব সামরিক বলয় গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে অকল্পনীয় মাত্রায় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করে মিয়ানমারকে মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে।
এমনি এক প্রেক্ষাপটে একদিকে কেন্দ্র তথা সেনাশাসকদের বিরুদ্ধে সব সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে এক ডজনেরও বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। এসব গ্রুপকে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে সামরিক জান্তা তথা চীনবিরোধী শিবির। অন্যদিকে মিয়ানমার ও তার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে নিজ স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর পূর্বে প্রণীত বার্মা অ্যাক্টের সংশোধিত রূপসহ নতুন এক রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের অধীনে এই রূপরেখা মিয়ানমারের স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল (এসএজি) তথা সেই দেশের সামরিক জান্তার ওপর গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে আরও চাপ প্রয়োগ করবে এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার লক্ষ্যে যারা সংগ্রাম করছে, তাদের আরও বেশি সহায়তা করবে এমনটাই প্রত্যাশিত। এ রূপরেখায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নানারকম নিষেধাজ্ঞাসহ সাত ধাপের কার্যক্রম পরিচালনায় মার্কিন প্রশাসনকে অনুমোদন প্রদানের মূল উদ্দেশ্য হলো সে দেশের সামরিক জান্তাবিরোধী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্টকে (এনইউজি) আরও অধিক সহায়তা প্রদান। তবে এথনিক আর্মড অর্গানাইজেশন (এএও) নামে পরিচিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোকে এ রূপরেখার আদলে সহায়তার প্রকাশ্য সুযোগ নেই বলা হলেও ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়, আমেরিকা গোপনে অন্য রাষ্ট্র বা সংস্থার মাধ্যমে জান্তাবিরোধীদের সহায়তা করে চলেছে বলেই মিয়ানমারের সেই প্রতাপশালী সামরিক জান্তার আজ এমন লেজে-গোবরে অবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে অস্ত্র না দিলেও দেশটির অন্যতম সামরিক মিত্র ইসরায়েল ১০০ ট্যাংক, সামরিক নৌযান ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়ে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার মাধ্যমে মুসলমান রোহিঙ্গাদের নিধনে উৎসাহ দিচ্ছে বলে ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তথ্য প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট মনিটর নামক সংবাদমাধ্যম। অবমুক্ত হওয়া এবং ফাঁস হওয়া গোপন নথিতেও বারবার উঠে এসেছে ইসরায়েল কর্তৃক মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান ও অস্ত্র সরবরাহের সংবাদ। ২০১৭ সালেই ইসরায়েলের হাই কোর্ট মিয়ানমারে কোনো ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০২৩ সালে এসেও বিভিন্ন ইসরায়েলি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহ করছে বলে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে তথ্য দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ ওয়েবসাইট মিডল ইস্ট আই। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে দেখা যায় মিয়ানমারের বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন জাতিসত্তার সংগঠনগুলো বহির্বিশ্বে সক্রিয় রয়েছে। মিয়ানমারের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিবাসীরা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে একদিকে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করেছেন, অন্যদিকে নিজের অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের জন্য সার্বিকভাবে বিশ্বজনমত গঠন এবং নিজ মাতৃভূমিতে সাংগঠনিক ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করছেন। এমনকি কোনো কোনো অঞ্চল তাদের বৈদেশিক শাখার মাধ্যমে নিজস্ব সংবিধান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার যাবতীয় দলিল প্রণয়ন করছে বলেও তথ্য রয়েছে। এসব কর্মকান্ড বিচারে অনেকেরই ধারণা-অচিরেই মিয়ানমার ভাঙনের মুখে পড়বে কিংবা একসঙ্গে থাকলেও কেন্দ্রীয় শাসনের বদলে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের এক নতুন উদাহরণ স্থাপন করবে। বিশ্লেষকদের আরও ধারণা- বৈদেশিক এই কর্মকান্ডের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, দীর্ঘদিন চীন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক জান্তাকে নিরঙ্কুশ সমর্থন প্রদান করলেও সাম্প্রতিক সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে দ্বৈত ভূমিকায়। বিভিন্ন কর্মকান্ডে বিশেষত আঞ্চলিক সামরিক সংগঠন বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সামরিক দলগুলোর বিভিন্ন কার্যকলাপ, যুদ্ধের ধরন, ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের নমুনা এবং একের পর এক সাফল্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, তাদের নেপথ্যে রয়েছে একটি পরাশক্তি, যারা একটি সুপরিকল্পিত ছক তুলে দিয়েছেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে, আর জোগান দিয়েছেন নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা। অনেকের মতে, এই পরাশক্তি হলো চীন। এমন অবস্থানে যাওয়ার পেছনে চীনের বেশ কিছু যুক্তি থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। প্রথমত, কখনো যদি বিভিন্ন বিদ্রোহী আঞ্চলিক শক্তির চাপে কেন্দ্রীয় সরকার বা সামরিক জান্তার পতন ঘটে, তবে চীন চাইবে না যে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শূন্য থেকে শুরু হোক অথবা অতীতের তিক্ততার প্রসঙ্গগুলোই কেবল বারবার ঘুরেফিরে আসতে থাকুক। দ্বিতীয়ত, চীন কেন্দ্রীয় সরকারকেও বুঝতে চেয়েছে যে বার্মা অ্যাক্ট বা অন্য কোনো কারণে আমেরিকার প্রতি কেন্দ্র, অবরোধ পাওয়া সামরিক জেনারেলরা বা অন্য কোনো শক্তি কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ করলে চীন আঞ্চলিক শক্তিগুলো ব্যবহার করে কেন্দ্রের পতন ঘটাতে পারে। তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইন অঞ্চলে চীনের যে বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার যে বৃহত্তর পরিকল্পনা রয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে চীন আঞ্চলিক শক্তি বা নন-স্টেট ফ্যাক্টরগুলোকেও কেন্দ্রের পাশাপাশি হাতে রাখছে। মিয়ানমারে চলমান ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে যারা ভাবছেন, তাদের কেবল কী ঘটছে তা দেখলেই চলবে না, দেখতে হবে কেন ঘটছে।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

email: directoradmin2007@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights