যারা ঋণ নিয়ে পাচার করছেন সংসদে তাদের তালিকা প্রকাশ করা হোক : এ কে আজাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ কে আজাদ বলেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছিল-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে। তারই আলোকে বলতে চাই, সবার আগে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পথনকশাকে স্বাগত জানাই।

সোমবার রাতে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির উপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে অংশ নিয়ে এ কথা বলেন এ কে আজাদ। এতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন।

এ সময় এ কে আজাদ বলেন, ‘যারা ঋণ নিয়ে কলকারখানায় বিনিয়োগ করে ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের ছাড় দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যারা ঋণ নিয়ে পাচার করেছেন, বিদেশে বেগম পাড়া, সেকেন্ড হোম বানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিচারের আওতায় আনা এবং এই সংসদে তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হোক।’
বাংলাদেশে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লক্ষ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা (সেপ্টেম্বর ২০২৩, বাংলাদেশ ব্যাংক) উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু অবলেপনের মাধ্যমে ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হয়।’

ফরিদপুর-৩ আসনের চার লক্ষাধিক ভোটারসহ সর্বস্তরের জনগণকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘(সংসদে বক্তব্য রাখার) এই সুযোগে আমি আমার এলাকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরতে চাই।’

এ কে আজাদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাহসী নেতৃত্ব ছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হতো না। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগও এক যুগান্তকারী ঘটনা। ঢাকা থেকে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত যে উন্নয়ন হয়েছে, তার সাথে ফরিদপুর শহরকে যুক্ত করা দরকার। আমরা ফরিদপুরকে আধুনিক, উৎপাদনশীল এবং স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এ জন্য ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা দরকার। দরকার ফরিদপুর-বরিশাল সড়ককে চার লেনে উন্নীত করা।’

তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে অথচ ফরিদপুরে আজ অবধি একটি বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি। উচ্চশিক্ষা বিস্তারে সরকারের আন্তরিকতার প্রতিফলন হতে পারে ফরিদপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।’

ফরিদপুর সদরের এমপি বলেন, ‘ফরিদপুরের ৪১৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের মধ্যে ২৫০ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা নাজুক। দ্রুত এর মেরামত হওয়া দরকার।’

মানবসম্পদকে উপযুক্ত করে প্রশিক্ষিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে এ কে আজাদ বলেন, ‘বিবিএস-এর ২০২২ সালের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়। তারা পড়াশোনায় নেই, কর্মসংস্থানেও নেই; এমনকি কোনো কাজের প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন না। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সসীমার এই নিষ্ক্রিয় তরুণের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ। অন্যদিকে, গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭ জন। আমাদের মানবসম্পদকে উপযুক্ত করে প্রশিক্ষিত করতে পারলে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে তেমনি দেশ থেকে রেমিট্যান্স চলে যাওয়াও ঠেকানো যাবে।’

গত পাঁচ যুগে জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর ছাড়া এশিয়ার কোনো দেশ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে পদোন্নতি পায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড তো পারেইনি, এমনকি মালয়েশিয়াও এখনও উচ্চ আয়ের দেশ হতে পারেনি। পৃথিবীর প্রায় শ’খানেক দেশ এখন মধ্যম পর্যায়ে পড়ে আছে। একে বলা হচ্ছে মধ্যম আয়ের ফাঁদ।’

এ কে আজাদ বলেন, ‘চারটি বড় শিকল একটি দেশকে মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে দেয়। ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা, কর খাতের কম রাজস্ব আদায়, রপ্তানিতে একক পণ্যনির্ভরতা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অতি কম সরকারি ব্যয়-এই চার শিকল ভাঙতে না পারলে আমরা মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে যাব।’

গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে চান জানিয়ে এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য বলেন, ‘সংসদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে, আমার ভোটারদের কাছে আমরা জবাবদিহি করতে চাই। আমরা গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করতে চাই। সে ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা আমরা প্রত্যাশা করি, মাননীয় স্পিকার।’

বক্তব্যের শুরুতে তিনি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বেদনার সাথে স্মরণ করেন ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের। তিনি স্মরণ করেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছাকে। কারাগারের অভ্যন্তরে নিহত চার জাতীয় নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ স্বীকারকারী দুই লাখ নারী, ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে জাতির সকল ক্রান্তিলগ্নের সংগ্রামী মানুষদের স্মরণ করেন এ কে আজাদ।

তিনি বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনকে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পঞ্চমবারের মতো এবং পরপর চারবারের মতো সরকার গঠন করেছেন। এই অসাধারণ কীর্তির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights