চুক্তি নিয়োগে দীর্ঘশ্বাস

ওয়াজেদ হীরা

♦ মন ভালো নেই বহু কর্মকর্তার ♦ যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারছে না ♦ চুক্তি নিয়োগ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন : সাবেক সচিব

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হলেও মন ভালো নেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও অনেক কর্মকর্তা যথাযথ পদোন্নতি বা পদ পাচ্ছেন না। এর অন্যতম কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। সম্প্রতি এর প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা ওপরের চেয়ারে যেতে পারছে না। ভিতরে ভিতরে নানা ক্ষোভ থাকলেও জুনিয়র, সিনিয়র বা ব্যাচমেটদেরও বলতে পারছেন না। সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হলো সরকারের এখতিয়ার। আর সাবেক আমলারা বলছেন, প্রশাসনের শৃঙ্খলার স্বার্থেই এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ একেবারে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে চারজন সিনিয়র সচিব আছেন চুক্তিতে। বিভিন্ন সংস্থায় সিনিয়র সমমর্যাদায় আছেন আরও বেশি। সে কারণে অন্যরা ওই পদে যেতে পারছেন না। সচিব ছাড়াও বেতন কাঠামোর শীর্ষ স্তর গ্রেড-১ পদ ও অতিরিক্ত সচিব পদেও এখন চুক্তি নিয়োগের দাপট চলছে। প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বা সংস্থার দায়িত্বে চুক্তিভিত্তিক হিসেবে কাজ করছেন ১৫ জনের বেশি কর্মকর্তা। এর বাইরেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চুক্তিভিত্তিক। এর ফলে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ভিতরে ভিতরে কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। সচিবের মেয়াদ শেষে অনেকেই চুক্তি নিয়োগ পান। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত সচিবরা প্রশাসনের শীর্ষ পদ সচিব না হয়েই অনেকে অবসরে যাচ্ছেন। গত কয়েকদিন সচিবালয়ে সিনিয়র সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব পর্যায়ের কমপক্ষে ২০ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে চুক্তিনিয়োগ নিয়ে কর্মকর্তাদের মনোকষ্টের বিষয়ে জানা গেছে। সরকারি চাকরি করেন বিধায় কেউ সরাসরি কথা বলে ঊর্ধ্বতনদের বিরাগভাজন হতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রসঙ্গে বলেন, চুক্তিতে নিয়োগ নিয়ে নিচের স্তর নষ্ট করা যে ঠিক নয়, সেটি যারা সরকারপ্রধানকে বোঝাবেন তারাই যদি সেই সুবিধা গ্রহণ করেন তাহলে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা কে বাঁধবে? আগামী দু-এক মাসের মাসের মধ্যে কয়েকজন সচিব অবসরে যাবেন। ইতোমধ্যেই তারা আবার চুক্তিতে নিয়োগ পাবেন বলে আলোচনা শুরু হয়েছে। দায়িত্বশীল একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তারা নাকি সরকারের খুব ঘনিষ্ঠ। হতেই পারে। অবশ্য অনেকে মনে করেন যে, যারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য চেষ্টা করেন তারা নিজেরাই প্রচার করেন যে, তারা সরকারের খুব বিশ্বস্ত। তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রশাসনে অন্য যারা আছেন তারা কি সরকারের বাইরে? যারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেন তাদের ভাবা উচিত একজন সচিবের পদ যদি ফাঁকা হয়, তাহলে ২০ জন অতিরিক্ত সচিব তৈরি হয়। কিন্তু একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলে ওই ২০ জনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয় তাদের দীর্ঘশ্বাস দিন দিন বাড়তে থাকে। নাম প্রকাশ না করে একজন অতিরিক্ত সচিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের ব্যাচ থেকে অনেকেই সচিব হওয়ার যোগ্য হতে পারছে না। যাদের বয়স আছে তারা আশায় আছেন আর যাদের বয়স নেই তারা আফসোস, কষ্ট নিয়ে অবসরে যাচ্ছেন। চুক্তিনিয়োগ নিয়ে সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই নিয়োগে অনেক সমস্যা হয়। অনেকের কষ্ট হয়। আমাদের প্রশাসনের অ্যাসোসিয়েশন সব সময় এর বিরোধিতা করে। বেশির ভাগ কর্মজীবী মনে করেন এটি একটি অন্যায় ব্যবস্থা। এতে যাদের প্রমোশন হওয়া উচিত তারা বঞ্চিত হন। একেবারে ধাপে ধাপে এর প্রভাব পড়ে।

তিনি আরও বলেন, একজন সচিব চুক্তিতে নিয়োগ পেলে সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যন্ত প্রভাব পড়ে। তেমনি প্রধান প্রকৌশলী চুক্তিতে নিয়োগ পেলে তার নিচের সব ধাপে প্রভাব পড়ে। চুক্তি নিয়োগ মানেই বঞ্চনা বাড়ে। এটি সংগত নয়, যৌক্তিক নয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ একেবারে বন্ধ করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর সময়ে বলা হয়েছিল বিজ্ঞানী এবং বিশেষ প্রয়োজনে যাকে নিয়োগ না দিলে রাষ্ট্র অচল হয়ে যাবে সেসব ক্ষেত্রে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সচিবদের চাকরি হলো উচ্চপর্যায়ের কেরানির চাকরি। সুতরাং এই উচ্চপর্যায়ের কেরানিদের চুক্তিতে নিয়োগ কোনো প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি যে ১০ শতাংশ পদে নিয়োগ দিতে পারেন সেটিও উচ্চপর্যায়েই ভোগ করছে। কোনো পিয়ন পর্যায়ের কেউ সুবিধা পাচ্ছে না। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সেই কোটাও কমানো দরকার। মূলত বিজ্ঞানী বা যাদের ছাড়া দেশ চলবে না, অচল হয়ে যেতে পারে তারা ছাড়া সবারই চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া বন্ধ করা দরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তথ্যে জানা গেছে, সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে কর্মকর্তা রয়েছেন ৮৬ জন। মাঝের কয়েক বছর জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কমে এসেছিল যা আবার বাড়ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিতে কোনো এক কর্মকর্তাকে রেখে দেওয়ার অর্থ হলো- বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাবদ বাড়তি ব্যয় করতে হয় সরকারকে। শুধু বেতন দিতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় মাসে ৫০ লাখ টাকার বেশি। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যয় তো আছেই। সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তারা জানান, চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় যোগ্যতা আসলে সরকারের ঘনিষ্ঠ থাকা। সম্প্রতি রাজনৈতিক তদবিরে চুক্তি নিয়োগ হচ্ছে বেশি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সরকারের প্রয়োজনের বিষয়। যদি কাউকে প্রয়োজন হয় সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। কাউকে যদি সরকার এমন নিয়োগ দেয় তার মানে নিশ্চয়ই তার সার্ভিস প্রয়োজন। সে জন্যই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights