সেই ডিএজির আসল উদ্দেশ্য ফাঁস

প্রাক্তন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহমেদ ভূঁইয়া মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বিপরীতে গিয়ে একটি বিচারাধীন (সাব-জুডিসি) বিষয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পর তার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বহু জল্পনা-কল্পনা স্বাভাবিক কারণেই চাউর হয়েছিল। প্রথমত, তিনি সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার আদেশবিরোধী কথা বলে, একটি সাব-জুডিসি বিষয়ে কথা বলে এবং রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীদের বেলায় প্রযোজ্য বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে, এ অপকর্মের আইনগত পরিণতির কথা জেনেও কেন এটি চালিয়ে গেলেন সে প্রশ্ন জাগাই বাস্তবভিত্তিক।

অনেক জল্পনার একটি ছিল এই যে, তিনি নিয়মমাফিকই আইনের কবজায় পড়বেন আর তখনই সেই ছুতায় যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার পথ খুলে যাবে। যারা এমনটি ভেবেছেন তাদের ধারণাই নিশ্চিত বলে প্রমাণিত হলো তখনই যখন ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল সেই ডিএজি পরিবারের সবাইকে নিয়ে কাপড়-চোপড়সহ ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে হাজির হয়েছেন আশ্রয় প্রার্থনা করতে। তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট অবমাননার মামলা হওয়াই আইনের কথা। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত শুরু হওয়াও অস্বাভাবিক নয়, কেননা তার এ বেআইনি এবং অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপের পেছনে কী কী বিষয় কাজ করেছে, তার তদন্ত করার দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের নিশ্চয়ই রয়েছে। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদন না নিয়ে গণমাধ্যমে হাজির হয়ে বিধি লঙ্ঘন করে যে অসদাচরণ করেছেন তার জন্য তার পদ হারানো ছিল ন্যূনতম বিষয়, যা তার অজানা থাকার কথা নয়। মনে যাই থাকুক না কেন, কোনো অবস্থায়ই অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদন না নিয়ে তার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ ছিল না, যার কারণে তাকে পদচ্যুত করার কোনো বিকল্প ছিল না।

ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ভবনে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থান নেওয়া মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। অথচ এ ডিএজি স্ত্রী এবং মেয়েদেরসহ ছুটির দিন যেভাবে দূতাবাসের একটি কামরায় অবস্থান নিয়েছিলেন তার থেকে আন্দাজ করা খুবই যৌক্তিক যে দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার আগেই কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়েছিল। শোনা যায়, কোনো এক মন্ত্রীর তোষামোদেই নাকি তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদটি পেয়েছিলেন। এ কথা সত্যি হলে সেই মন্ত্রীকেই প্রশ্ন করতে হয় কেন তিনি এ ধরনের এক ব্যক্তির পক্ষ নিয়েছিলেন, যা কি না রাষ্ট্রের জন্য সমূহ সমস্যার সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুপারিশের কারণে অনেক জায়গায় অনেক অযোগ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা উঁচু পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এমন নজিরের অভাব নেই। এই অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসেই বছরখানেক আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজনকে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাবের কারণে পদায়ন করা হয়েছে, যার পিতা তার জেলার রাজাকারের লিখিত তালিকাভুক্ত। শুধু তাই নয়, সেই ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে জননেত্রী শেখ হাসিনা সুপ্রিম কোর্ট বারের একটি অনুষ্ঠানে যোগদানকালে ওয়াশরুম ব্যবহার করতে চাইলে, সেই সাধারণ সম্পাদক পদধারী ব্যক্তি ওয়াশরুমের তালা বন্ধ করে এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা যেন ওয়াশরুম ব্যবহার করতে না পারেন।
সে কথা সেই সময়ের প্রায় সব আইনজীবীই জানেন। এ ব্যক্তি সব সময়ই বিএনপিঘেঁষা ছিলেন, বিএনপির একজন সিনিয়র আইনজীবীর হাত ধরেই আইন পেশায় তার আগমন। সেই নেতৃস্থানীয় বিএনপি আইনজীবীর রাজনৈতিক আদর্শ তিনি সব সময় অনুসরণ করে সেই দলের প্রতি থেকেছেন অনুগত। গত ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং উক্ত বিষয়ক সাব-কমিটির প্রধান অ্যাডভোকেট কাজি নজিবউল্লাহ হিরুর উদ্যোগে এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য সিনিয়র অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের সভাপতিত্বে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা’ নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে আপিল বিভাগের তিনজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, তিনজন অতি উঁচু মর্যাদার বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকসহ অনেক গণ্যমান্য আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, নোয়াখালী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান (চান), মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন ফকির, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসেনসহ বহু গুণীজন। সে সভায় বরখাস্তকৃত ডিএজি এমরান ভূঁইয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আলোচক অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন ভাষায় বলেন, এখনো বহু ‘এমরান ভূঁইয়া’ অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে দাপটের সঙ্গে বিরাজ করছেন। নাম না বললেও এটি পরিষ্কার যে, তারা অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সেই বড় কর্তার কথাই উল্লেখ করছিলেন যিনি ওয়াশরুমের তালা বন্ধ করে দিয়ে বিরোধী নেত্রী, দেশরত্ন শেখ হাসিনার ওয়াশরুম ব্যবহারে পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন, যার পিতা তার জেলায় রাজাকারের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন, আইনের জগতে যার প্রবেশ বিএনপির একজন প্রভাবশালী অ্যাডভোকেট নেতার হাত ধরে, যাকে অনুসরণ করে তার রাজনীতি চর্চা। তিনি বিএনপির এক প্রাক্তন মন্ত্রীর পক্ষে (যিনি এখনো বিএনপির একজন প্রভাবশালী এবং সোচ্চার নেতা) মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুলও জারি করেছিলেন। সেই ব্যক্তি এখন অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। কয়েক মাস আগে জনৈক ডিএজি ৭১ চ্যানেলে এক টকশোতে হাজির হয়ে (সম্ভবত অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমোদন ছাড়াই) বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ একটি মুসলিম রাষ্ট্র’, যে বক্তব্য দ্বারা তিনি সংবিধান বিরোধিতায় নেমেছিলেন। কেননা সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। উক্ত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলে, তিনি বিভিন্ন ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে আবোল-তাবোল বলার চেষ্টা করেন। তিনি সে কথাই বলেছেন যেটি জামাতিদের এবং অন্য ধর্মান্ধদের কথা, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না। সেই অনুষ্ঠানের পরেই তাকে পদচ্যুত করা উচিত ছিল কিন্তু তিনি এখনো বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছেন। এরা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। সুযোগ পেলেই এরা যে এমরান ভূঁইয়ার মতো নিজের আসল রূপ নিয়ে হাজির হবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই।

এসব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগ দেওয়ার আগে এদের এবং এদের পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত তদন্ত করা উচিত ছিল। যাই হোক এমরান ভূঁইয়ার ঘটনার পর এসব মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের অবিলম্বে অপসারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যাতে এমরান ভূঁইয়া কৃত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। তা ছাড়াও ভবিষ্যতে এসব পদে নিযুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা রাষ্ট্রের কল্যাণেই প্রয়োজন হবে।

প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও সাবধান হতে হবে কারও পক্ষে সুপারিশ করার আগে। যে ব্যক্তির ব্যাপারে তারা সুপারিশ করবেন তার এবং তার পরিবারের ইতিবৃত্ত না জেনে সুপারিশ করা কোনো অবস্থায়ই কাম্য হতে পারে না। আশা করা যায় এমরান আহমেদ ভূঁইয়ার ঘটনা থেকে তারা শিক্ষা পাবেন এবং ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *