ব্রেইনড্রেন: আমাদের উন্নয়নের অগ্রগতিতে এক প্রতিবন্ধকতা
ঝুমা আক্তার
ব্রেইনড্রেন অর্থাৎ মেধাপাচার। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক অতি পরিচিত একটি শব্দ। একটি দেশের শিক্ষিত, দক্ষ, প্রগতিশীল এককথায় সর্বোচ্চ মেধাবীরা যখন নিজ দেশ ত্যাগ করে ভিনদেশ পাড়ি জমায় তাকে ব্রেইনড্রেন বলে।
একজন মেধাবীর জ্ঞানের আলোয় শুধু ব্যক্তি নিজে আলোকিত হয় না। তার পারিপার্শ্বিক সমাজ, রাষ্ট্রকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। কিন্তু ব্রেইনড্রেনের প্রভাবে আমরা এই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
উচ্চশিক্ষা অর্জন ও উন্নত জীবন-যাপনসহ নানা কারণে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতিসহ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ পাড়ি জমাচ্ছ বিদেশে।
বৈশ্বিক ব্রেইনড্রেন ইনডেক্স এর তথ্য মতে, নিজ দেশ থেকে বাইরের দেশে চলে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৩১তম।
UNESCO এর এক জরিপ মতে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ৭০ থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থী পাড়ি জমায় ভিনদেশে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিব্যাচের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যায়। খুব কম সংখ্যাক শিক্ষার্থী দেশে ফিরে আসে। অথচ সরকার প্রতিবছর এ সকল মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরির পেছনে খরচ করছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে ব্রেইনড্রেন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কী?
যে দেশে সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার, সুষমবন্টন থাকে, সে দেশ স্বল্প সময়েই অগ্রগতির পথে ধাবিত হয়। কিন্তু, দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। তবে আমাদের দেশে মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। কিন্তু আমাদের দেশে যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না। তাদেরকে যথাযথ সম্মান এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ দেওয়া হয় না। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্রেইনড্রেন। এছাড়াও আরো অনেক কারণ জড়িত যেমন : ক্রমহ্রাসমান জীবনযাত্রার মান,বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি, শিক্ষাক্ষেত্রে যথার্থ পরিবেশের অভাব, সামাজিক বৈষম্য, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
তবে যে বিষয় গুলো শিক্ষার্থীদের ব্রেইনড্রেনে আকৃষ্ট করে তা হলো; উন্নত জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, আইন শৃঙ্খলার সুব্যবস্থা, বিশ্বায়নের সুযোগ-সুবিধা ভোগের অপার সম্ভাবনা ইত্যাদি।
অদূর ভবিষ্যতে দেশে এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উপরন্তু, এখনই তার অনেকখানি প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দক্ষ শ্রমিকের সংকটে বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বিদেশী শ্রমিকদের দিয়ে। প্রতিবছর ৪৫ হাজার কোটি টাকা প্রবাসীরা নিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ থেকে। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ পরিচালনায় যোগ্য জনবলের বিশাল সংকট তৈরি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই সমস্যা সমাধানে করণীয় কী হতে পারে?
পার্শবর্তীদেশ চিন, ভারত, তাইওয়ান ব্রেইনগেইন করার জন্য যে সকল প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। অদূর ভবিষ্যতে মেধার অপচয় রোধ করতে সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এখনই। যেমন: উচ্চশিক্ষিতদের উচ্চ বেতন, চাকরি, জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে, উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরির জন্য মুলধনের ব্যবস্থা করতে হবে, মেগাপ্রকল্পগুলো তাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে ইত্যাদি।
