রোজা রাখার মরতবা

এম এ মান্নান

রোজা ফার্সি শব্দ যার আরবি হলো সিয়াম। বাংলায় যার অর্থ বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকার নামই রোজা। রোজাদারকে পানাহার থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি যাবতীয় গুনা থেকেও বিরত থাকতে হয়।

কারণ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রাখার পরও মিথ্যা বলা ও খারাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকে না তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ বুখারি।

জৈবিক তাড়না থেকে মানুষকে বিরত রাখাই রোজার বিধান। পেটের মতো চোখ, কানসহ প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অনুভূতির সিয়াম পালন করার মধ্যেই রোজার সার্থকতা। হারাম কাজ থেকে বিরত রেখে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অনুভূতিকে তাদের জন্য নির্ধারিত ইবাদতে ব্যস্ত রাখাই রোজার লক্ষ্য। রোজার আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বান্দাকে গুনামুক্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে মুত্তাকি হিসেবে গড়ে তোলা।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ সূরা বাকারার ১৮৩ ও ১৮৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করছেন, ‘হে বিশ্ববাসী! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পার। সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের, এ সময় তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ কিংবা ভ্রমণে থাকবে, তাকে অন্য সময় রোজা পূরণ করে নিতে হবে।’

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবানেও রমজানের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে নানাভাবে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর প্রেরিত রসুল- এ মর্মে সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ সম্পাদন করা, রমজানের রোজা পালন করা।’ বুখারি, মুসলিম।

তিনি আরও বলেছেন, ‘যে লোক ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভেঙে ফেলবে, এরপর সে সারা জীবন রোজা রাখলেও তার ক্ষতি পূরণ হবে না।’ তিরমিজি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ, ইবনে খুজায়মা।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘ইসলামের শিকড় ও ধর্মের বুনিয়াদ তিনটি : আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই- এ সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ ও রোজা। যে লোক এর একটি পরিত্যাগ করবে, সে কাফির হিসেবে গণ্য হবে।’

রোজা অবশ্যই এমন একটি ইবাদত যা মমিনদের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা দান করে। শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক দিক থেকেও রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যে কারণে রোজা বান্দার জন্য মাবুদের রহমত-বিশেষ। তাই আমাদের সবাইকে ইখলাসের সঙ্গে রোজা রাখতে হবে। কারণ আমল যদি নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর জন্য না করা হয় তাহলে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ বলছেন, আমি শিরককারীদের শিরক থেকে সর্বতোভাবে মুক্ত। কাজেই যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করে যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকেও বর্জন করি এবং তার শিরককেও বর্জন করি।’ মুসলিম।

আবু উমামা আল বাহিলি (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আপনি ওই ব্যক্তি সম্পর্কে কী মনে করেন যে সওয়াব ও খ্যাতি উভয়টি লাভের নিয়তে যুদ্ধ করে? তিনি উত্তর করলেন, তার জন্য কিছুই মিলবে না। এ কথাটি তিনি তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে বললেন, তার জন্য কিছুই মিলবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ওই আমল কবুল করেন না, যা তাঁর জন্য খালিসভাবে করা না হয় এবং তা দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য না হয়।’ নাসায়ি।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রসুল! একজন লোক জাগতিক ধনসম্পদ অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে চায়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তার জন্য কোনো সওয়াব নেই। তাঁকে এ বিষয়ে তিনবার জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি একই জবাব দেন।’ আবু দাউদ। অতএব আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উদ্দেশে ইবাদত-বন্দেগি করলে বিন্দু পরিমাণ সওয়াব পাওয়া সম্ভব হবে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা রোজার নাম দিয়েছেন ‘অটোফেজি’ এবং এর উপকারিতা নিয়ে গবেষণা করে জাপানি চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওশোমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কারণ রোজার যে উপকারিতা, বৈজ্ঞানিকভাবে তিনি খুব সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন।

আমাদের দেহকোষগুলোতে নিয়মিত টক্সিন বা বিষাণু সৃষ্টি হয় এবং এই দেহকোষগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত বাইরে থেকে খাবার পায়, সে খাবার খেতে থাকে। আর যত খাবার পাবে তত সে খেতে থাকবে। কিন্তু যখন দীর্ঘসময় আমরা রোজা রাখি, তখন এই কোষগুলো বাইরে থেকে কোনো খাবার পায় না। ফলে সে ক্ষুধার্ত হয়ে যায়। আমাদের যে রকম বেশি ক্ষুধা লাগলে খাবারের মান নিয়ে কোনো বাছবিচার করি না। যা পাই, তাই খাই।

তেমনি দেহকোষগুলো যখন ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়, তখন ভালো-মন্দ বিচার করে না। দেহের ভিতরে থাকা বিষাণুগুলোকেই তারা খেয়ে ফেলে। ফলে দেহের ভিতরে জমতে থাকা টক্সিনগুলো দূর হয়ে যায়। যে টক্সিনগুলো ছিল দেহের আবর্জনা, সেগুলোকেই দেহকোষ তখন হজম করে শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

রমজানে রোজাদার নির্দিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত হয় আবার নির্দিষ্ট সময় পানাহার করে। যার মাধ্যমে তার ভিতরে তৈরি হয় তাকওয়া, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সংযমী মনোভাব। সে খুব সহজেই নিজেকে কুপ্রবৃত্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তাই রোজাদার ইচ্ছা করলে বিড়ি-সিগারেট, নেশা ও জিনা-ব্যভিচারের মতো বদাভ্যাস পরিহার করতে পারে অনায়াসে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমেনা খাতুন হাফেজিয়া কোরআন রিসার্চ অ্যান্ড ক্যাডেট ইনস্টিটিউট কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights