অনুভূতির রাজনীতি ১

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ সামনে এগোয়, কারণ আপোস করতে করতে, পেছোতে পেছোতে পেছোনোর আর জায়গা থাকে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ কোনো কিছুর আর পরোয়া করে না, যা হয় হোক, সব প্রতিবন্ধকতা ভেঙেচুরে হলেও সামনে এগোয়। নববর্ষের বাংলাদেশকে দেখে তেমনই মনে হলো আমার।

বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা করলে যাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে, তারা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাদের হুংকারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, পরাধীনতা, ভিন্ন সংস্কৃতির আস্ফালন এবং আগ্রাসন মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছিল। বাঙালি সত্যি সত্যিই অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। পহেলা বৈশাখের ভোরের স্নিগ্ধ আলো তাদের ঘুম ভাঙালো। নিজের ভাষা আর সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তারা নিশ্চিতই অনুভব করলো। সারা দেশে সারা দিন তারা জাঁকজমক করে পালন করলো বাংলা নববর্ষের উৎসব। মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু ঢাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন শহরেও বেরিয়েছে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান আগের মতোই অসাধারণ। কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ১৪ কিলোমিটার রাস্তায় আলপনা এঁকেছেন ৬৫০ জন শিল্পী। নড়াইলের মেয়েরা নববর্ষের সাজে সেজে সাইকেল চালিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে বহন করে অনেকটা পথ নিয়ে গিয়েছে। ময়মনসিংহের লোকেরা “অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত স্বদেশ চাই, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জেগে ওঠো বাংলাদেশ” লেখা ব্যানার নিয়ে রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা করেছে। শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরে, যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই নববর্ষ পালিত হয়েছে। নিউইয়র্কের টাইম স্কয়ারে মহীতোষ তালুকদার তাপসের পরিচালনায় গত বছরের মতো এ বছরও ঘটা করে নববর্ষ উদযাপন করা হলো। এ বছরের উৎসব গত বছরের চেয়ে ঢের বড় ছিল। ঢের জমকালো ছিল। সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে সারা দেশের উৎসব দেখার সুযোগ হয়েছে। ঠিক এভাবেই বাঙালিকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে বাঙালি হিসেবে টিকে থাকতে চাইলে। আমি এবারের নববর্ষের উৎসবকে উৎসবের চেয়ে বেশি আন্দোলন হিসেবে দেখছি। বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন করার যে অশুভ শক্তিটি ক্রমশ দানবে পরিণত হচ্ছে, সেটির বিরুদ্ধে এবারের নববর্ষের উৎসব ছিল একটি ছোটখাটো সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আরও বিশাল করতে হবে, আরও বিস্তৃত, আরও ব্যাপক, যেন সাম্প্রদায়িক অপশক্তি গর্তে লুকোতে বাধ্য হয়। তবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সেটি যতই সফল হোক, যথেষ্ট নয় দেশকে প্রগতিশীলতার পথে চালিত করার জন্য। সামাজিক আন্দোলন অচিরে শুরু করতে হবে। সমাজকে সভ্য করতে হবে। সমতার সমাজ তৈরি করতে হবে, যে সমাজে নারী পুরুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। যে সমাজে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান, ধার্মিক এবং অধার্মিক, সমকামী, রূপান্তরকামী এবং বিষমকামী, ধনী এবং দরিদ্র একই রকম অধিকার এবং স্বাধীনতা ভোগ করবে। সামাজিক বিপ্লব জরুরি, একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আধুনিক হওয়া জরুরি। সব রকম ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, অসমতা থেকে রাষ্ট্রকে দূরে সরতে হবে। সব রকম বৈষম্য আর পক্ষপাত থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত হতে হবে।
২

ট্রান্সজেন্ডার বিষয় নিয়ে ‘রূপান্তর’ নামে একটি নাটকে একটি প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের স্মার্ট ফ্রিজের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হওয়ায় বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছে তারা। শুধু তা-ই নয়, বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে সব ধরনের বিজ্ঞাপনী চুক্তিও বাতিল করেছে। সাফ সাফ বলে দিয়েছে, দেশের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো কর্মকান্ড তারা কখনো সমর্থন করে না এবং এসব কর্মকান্ডে কখনো যুক্তও থাকে না। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, তাদের আদর্শ ও নীতিমালার পরিপন্থী ছিল ‘রূপান্তর’ নাটকটি। ফেসবুক-ইউটিউবসহ সব মাধ্যম থেকে তাই নাটকটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আইনি নোটিসে বলা হয়, বিজ্ঞাপনী সংস্থার স্বত্বাধিকারীর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত ছ’টি নাটকে ফ্রিজের বিজ্ঞাপন প্রচার করতে সম্মত হয় তারা। শর্ত ছিল নাটকগুলোতে দেশের আইন, নীতি, নৈতিকতা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে-এরকম কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে ‘রূপান্তর’ নাটকটি যেহেতু মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে, সেহেতু প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপন উঠিয়ে নিয়েছে। এবং সঙ্গত কারণেই রূপান্তর নাটকটি প্রচার করাও সম্ভব হচ্ছে না।

রূপান্তরকামীদের মানবাধিকার নিয়ে কথা বললে কাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে? সংকীর্ণ একটি গোষ্ঠীর। এই গোষ্ঠী এমন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে এদের অনুভূতি বুঝে সরকারকে, সমাজকে, সমাজের প্রতিটি মানুষকে, এমনকী প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চলতে হয়। এরা বহুকাল অনুভূতির রাজনীতি করছে এবং এই রাজনীতিতে তাদের কোনো প্রতিপক্ষ নেই। এরা অনুভূতির দোহাই দিয়ে যত অনাচার মন চায়, তত অনাচারই করছে। অনাচার করতে করতে দেশ কিন্তু এক সময় নরকে পরিণত হবে। দেশ নরক হলে তাদের কোনো অসুবিধে নেই। কারণ সভ্য মানুষের জন্য যা নরক, তা তাদের জন্য স্বর্গ।

রূপান্তরকামীদের অধিকার আজ সমস্ত সভ্য দেশে স্বীকৃত। এই দেশকে সভ্য হতে দিতে চাইছে না এই সংকীর্ণ বিবর্তনবিরোধী প্রগতিবিরোধী লোকেরা। মানুষ যদি এদের ভয়ে গর্তে লুকোচ্ছে, আর যাদের সামর্থ্য আছে, তারা দেশ ত্যাগ করছে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এত বিপুল পরিমাণে দেশ ছাড়ছে যে আশঙ্কা হয়, হয়তো আর কিছুকাল পর দেশে সংকীর্ণ ছাড়া উদার, এবং যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষ বাস করবে না। দেশ ওদেরই হবে, যারা দেশবিরোধী।

৩

সালমান খান বুঝে হোক, না-বুঝে হোক, একদিন এক কৃষ্ণসার হরিণকে গুলি করে মেরেছিলেন। এটি আর কাউকে না হোক, ভীষণ ক্ষুব্ধ করেছে বিষ্ণোই সম্প্রদায়কে। এই সম্প্রদায় কৃষ্ণসার হরিণকে পুজো করে। বিষ্ণোইরা হিন্দু ধর্ম থেকে বের হওয়া একটি গোষ্ঠী বা উপজাতি। ভারতীয় উপমহাদেশে এরকম অসংখ্য জাতি এবং উপজাতি আছে যারা বিভিন্ন পশু বা পাখিকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করে। সেই সব পশু পাখিকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। কুকুর বেড়াল, হাতি গরু, বাঘ সিংহ, সাপ খোপ- এসবকেও পবিত্র বলে মানার লোক আছে, এসবকে পুজো করার লোক আছে। হিন্দুরা গরুকে পবিত্র বলে, মা বলে মানে। গরুকে হত্যা করলে কট্টর হিন্দুরা মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করে না। সালমান খানের ওপর যে রাগ ছিল বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের লোকদের, সে রাগ এখনো কমেনি, তাই বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের গ্যাং স্টার লরেন্স বিষ্ণোই জেলে বসেই লোক পাঠিয়ে সালমান খানকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। গুলিতে সালমান খান মারা যাননি, বরং যারা গুলি করেছে, তারা ধরা পড়েছে। এই ভায়োলেন্সের পেছনেও আছে অনুভূতি। অনুভূতিতে আঘাত লাগলে একেক জন উন্মাদ হয়ে ওঠে।

প্রতিনিয়ত আমার অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। আমার চারপাশের মানুষেরা কেউই আমার আদর্শ আর বিশ্বাসের ধারে কাছে নেই। তাদের সঙ্গে না যায় কথা বলা, না যায় পথ চলা। কিন্তু আমি অভিযোগ করি না যে আমার চারপাশের মানুষ আমার অনুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে। আমি জানি এই পৃথিবীতে নানা মতের এবং নানা বিশ্বাসের মানুষ বাস করে, সবার মত এবং বিশ্বাস এক নয়, সুতরাং অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া স্বাভাবিক। যেহেতু আমি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ, অনুভূতির মায়ায় আমি কেঁদে বুক ভাসাই না, আমি রাগ করি না, আমি অভিযোগ করি না। কারণ আমি ভিন্নমতের সঙ্গে চলতে শিখেছি। ঠিক একই রকম আমার মতের বিরুদ্ধের মানুষগুলো যদি প্রাপ্তবয়স্ক হতো, তাহলে কোনো অসুবিধে ছিল না, তারা আমাকে নিশ্চয়ই জোর করতো না তাদের মতের সঙ্গে একমত হতে। অন্যের কথায় বা কাজে যারা অনুভূতিতে আঘাত পেয়েছে বলে দেশজুড়ে তুলকালাম কান্ড ঘটায়, তারা নিশ্চয়ই আজও অপ্রাপ্তবয়স্ক। এই অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রাপ্ত বয়স্ক করে তোলার ভার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেই নিতে হবে।

৪

ইসরায়েল গাজায় আক্রমণ করছে, ইরান সে কারণে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়েছে, ইসরায়েলের ওপর ইরান কেন হামলা চালালো, সে কারণে ইসরায়েল এখন ইরানকে দেখে নেবে। পারমাণবিক বোমা, আমরা অনুমান করছি, দুই দেশেই আছে। পরস্পরের প্রতি তাদের এই রাগ, এই ক্রোধ কোথায় গিয়ে ঠেকবে? এরা কি এখন অবুঝের মতো বোমা ছোড়াছুড়ি করবে? কারণ তাদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে? এত যে শান্তির জন্য প্রার্থনা হয়, তারপরও যুদ্ধ বন্ধ হয় না পৃথিবীতে। যুদ্ধ লেগেই থাকে। তুচ্ছ কারণে যুদ্ধ। হিংসে, দ্বেষ, ঘৃণা, দম্ভ প্রকাশ করতে যুদ্ধ। পৃথিবী, আমার মনে হয় না, প্রাকৃতিক কোনো কারণে ধ্বংস হবে। একে ধ্বংস মানুষই করবে। পারমাণবিক বোমাই যথেষ্ট একে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য। এ সময় আমি বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করবো না। আমি শুধু নিজের একটি সহজ সরল কবিতা বলবো। কবিতার নাম যুদ্ধ।

ওদের অস্ত্র আছে, তাই যুদ্ধে নেমেছে।

ওরা ধ্বংস ভালোবাসে, তাই যুদ্ধে নেমেছে।

তুমি আমি চলো চুম্বন করি ঠোঁটে,

চলো মধ্যম আঙুল দেখাই যুদ্ধবাজদের।

চুম্বনে সিক্ত হয়ে চলো তুমি আমি এক একটি দেশ হয়ে উঠি,

তোমার নাম আজ থেকে রাশিয়া, আমি ইউক্রেন।

তুমি যদি কিউবা, এল সালভাদর, নিকারাগুয়া,

তুমি যদি পানামা,

তুমি যদি ইরাক, আফগানিস্তান,

আমি আমেরিকা।

তুমি আজ ইসরায়েল, আমি ইরান, আমি ফিলিস্তিন,

আমি ভারত, তুমি চীন।

চলো চুম্বন করি, আর মধ্যম আঙুল তুলে ধরি নৃশংসতা আর ধ্বংসস্তূপের দিকে।

যত অস্ত্র আছে জগতে, যত পারমাণবিক বোমা, সব জড়ো করে

একটি গভীর চুম্বনের সামনে কেউ দাঁড় করাতে পারবে না,

হেরে যাবে।

কোনো ভয়াবহ মারণাস্ত্রও একটি সাদামাটা চুম্বনের চেয়ে শক্তিশালী নয়।

চলো চুম্বন করি,

চলো পরস্পরকে স্পর্শ করি ভালোবেসে।

সন্তান জন্ম নিক আমাদের। সে সন্তানের নাম দেবো : পৃথিবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights