আন্ডার ওয়ার্ল্ড গডফাদার নাসিম!

জমির বেগ, ফেনী প্রতিনিধি

ফেনী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকেটে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে ফেনীবাসী শুধু গডফাদার নয়, জানতো আন্ডার ওয়ার্ল্ড গডফাদার হিসেবে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে নাসিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন বলে প্রচার রয়েছে। দলীয় ও প্রশাসনের কোনো পদে না থেকেও তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে ভূমিকা রাখায় সবাই তাকে সমীহ করে চলতো। ফেনীতে যখন যে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতেন তারা প্রথমেই নাসিমের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করতো। জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ছিলেন নাসিমের অনুগত। তিনি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রায় সবাইকে নাম ধরে ও তুমি সম্বোধন করতেন। ফেনী আওয়ামী লীগের সকল ব্যানার ফেস্টুনে নাসিমের নামের আগে লেখা হতো ‘ফেনীর অভিভাবক’। এই সকল সুযোগ সুবিধার কারণে তিনি হয়ে উঠেন অপ্রতিরোধ্য।

নাসিমের আশ্রয় প্রশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে নাসিমের ছোট ভাই ব্যাংকার জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রকাশ পাপ্পু ও তার চাচাতো ভাই পরশুরাম পৌরসভার সাবেক মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সাজেলের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট চোরাকারবারি, চাঁদাবাজী, চেন্ডারবাজি, বালু মহাল দখলসহ সকল অপকর্মে জড়িত ছিলো। নাসিমের বাড়ি সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামের গুথুমা গ্রাম। এই সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা থেকে অবৈধভাবে, গরু, চিনি, শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক আসে বাংলাদেশে। ফেনসিডিল, গাঁজা, ভারতীয় বিভিন্ন ধরনের মদও আসে সীমান্ত দিয়ে। এই সীমান্তভিত্তিক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতো তারা।

পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কামাল মজুমদারসহ ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার অনেক জনপ্রতিনিধিরা চোরাকারবারি, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজি, বালুমহাল দখলসহ সকল অপকর্মে জড়িত। তাদের নির্যাতনে স্বদলীয় প্রতিপক্ষরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অনাদি রঞ্জন সাহা বলেন, কয়েক মাস আগে এই বাহিনীর হাতে তিনি মারধরের শিকার হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাদের প্রকাশ্যে নির্যাতন করা হতো। এ ব্যাপরে জানতে চাইলে জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মুঠোফোনে জানান, তিনি এবং তার পরিবারের কোনো সদস্য কোনো অন্যায় বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ফেনী-১ আসন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নাসিম। এর আগে তার পরিচয় দেয়ার মতো ছিলো না কোন পদবি। দলীয় কোন পদবি না থাকলেও তখনকার ফেনীর একমাত্র নিয়ন্ত্রক নিজাম হাজারী নাসিমকে ‘অভিভাবক’ খেতাব দেন। তারপর থেকে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের অভিভাবক হিসেবেই তিনি পরিচিত। আলাউদ্দিন নাসিম ফেনীতে যখনই আসতেন তাখন তাকে ফেনী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খায়রুল বাশার মজুমদারকে (তপন), জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীসহ প্রায় সকল জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতৃবৃন্দ পা ছুঁয়ে সালাম করতো। তিনি একসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারপর বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ‘প্রটোকল অফিসার’ থাকায় সবাই তাকে সমীহ করতো। এর বাইরে শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তার রয়েছে আলাদা একটা পরিচয়।

একজন অগ্রহণযোগ্য ও বাজে আচরণের মানুষ খায়রুল বশর মজুমদার তপনকে জাসদ থেকে এনে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বানান আলাউদ্দিন নাসিম। এজন্য দলে রয়েছে চরম অসন্তোষ।

নাসিমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জঘন্য অভিযোগ, তিনি ২০১৭ সালে পরশুরামের চিথলিয়ায় আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম কলেজ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন অন্যের জায়গা দখল করে। অভিযোগ আছে ২০১৬ সালে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি কিছু জমি জোর করে নামমাত্র মূল্যে লিখে নেন। পরে কলেজের আশপাশে প্রায় ৩০ একর জমি দখল করে নেন। মোসলেহ উদ্দিন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তার পরিবারের প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে আলাউদ্দিন নাসিম। তার নিজের নামে ২০ শতাংশ জমি দানপত্র তৈরি করে লিখে নিয়েছেন। এই জমির বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু তাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩ লাখ টাকা। ভুক্তভোগীরা নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভয় দেখিয়ে, জোর করে নামমাত্র মূল্যে তাদের জমিগুলোর রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে নাসিম। জমির তিন ভাগের এক ভাগ দামও তাদের দেয়া হয়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নাসিমের লোকজন প্রথমে লাল পতাকা টানিয়ে দিয়ে জমি দখল করেন। লাল পতাকা টানানোর পর বলা হতো, এই জমিগুলো অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। পরে দেখা যায়, অধিগ্রহণ নয়, দখল করা হয়েছে। এ ব্যাপারে গত কয়েকমাস আগে আলাউদ্দিন নাসিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমির দাম বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। জোর করে জমি দখল নেয়া হয়নি। জমিগুলো অনাবাদি হওয়ায় কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা বলায় স্থানীয়রা স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছেন।

এদিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় নাসিম নিজের ও স্ত্রীর নামে ১০৮ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩ কোটি ৫৭ হাজার ২৯৫ টাকা এবং তার স্ত্রীর ৬৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫০ টাকা দেখালেও স্থানীরা জানায় তথ্যে গড়মিল রয়েছে। আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ইতোমধ্যে অভিযোগ জমা পড়েছে। গত ১৫ বছরে তিনি অবৈধ উপায়ে বিপুল অর্থ উপার্জন ও পাচার করেছেন বলে এই অভিযোগে বলা হয়।

আলাউদ্দিন নাসিম ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নাসিম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রটোকল কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে গেলে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার প্রটোকল কর্মকর্তা হন। পরবর্তী সময়ে তিনি সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। শেখ হাসিনার প্রটোকল কর্মকর্তা থাকাকালেই নাসিমের নানামুখী যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

যেভাবে ফেনীর রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হন নাসিম: ফেনীতে একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক ছিলেন গডফাদার খ্যাত জয়নাল হাজারী। জয়নাল হাজারী আমলে নাসিম শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসার থাকলেও জয়নাল হাজারী তাকে কোন মূল্যায়ন করতো না। তাকে ফেনীতে কোন রকম সাইডও দিতো না। ওয়ান ইলেভেনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধাওয়া খেয়ে জয়নাল হাজারী ভারতে পালিয়ে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর নাসিমের কারিশমায় হাজারী ফেনীর রাজনীতিতে সুবিধা নিতে পারেননি। ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ফেনী আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই পুনর্গঠনের মূল কারিগর ছিলেন আলাউদ্দিন নাসিম। জয়নাল হাজারীকে ঠেকাতে ওই পুনর্গঠনে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা আকরাম হোসেন হুমায়ুনকে সামনে রেখে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে জয়নাল হাজারীর অনুসারীদের তোপের মুখে আকরাম হোসেন হুমায়ুন। ওই নির্বাচনে ফেনী-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। ওই নির্বাচনে সারা দেশে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় হলেও ফেনী জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের কোথাও আওয়ামী লীগের কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি। তখন জেলা আওয়ামী লীগের যারা নেতৃত্বে ছিলেন তারা চেষ্টা করলে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে জয়ী করে আনতে পারতেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জানান। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আলাউদ্দিন নাসিম আন্ডার গ্রাউন্ডে থেকে জেলার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।

এ সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে প্রকাশ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জেলার মাঠের রাজনীতির এক পক্ষ জেলা যুবলীগের তখনকার আহবায়ক আজহারুল হক আরজু ও যুগ্ম আহবায়ক শাখাওয়াত হোসেন নিয়ন্ত্রণ করতো। আরেক পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করতেন ফেনী পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম। তার পক্ষে ছিলো জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দিদারুল কবির রতন ও সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীলের নেতৃত্বে পুরো ছাত্রলীগ। এই সুযোগে দুই পক্ষকে মিলিয়ে দেয়ার মিশনে নেমে নিজাম হাজারী আস্তে আস্তে দুই পক্ষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আনার চেষ্টা করে। একরামকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও আরজু পক্ষকে বাগে আনতে পারেননি। আরজু পক্ষ শেষ পর্যন্ত জয়নাল হাজারীর পক্ষ সমর্থন করে। এরই মাঝে পর্দার আড়ালে থেকে নিজাম হাজারীকে প্রথমে মেয়র ও পরে সদর আসনের সংসদ সদস্য বানান নাসিম। একসময় পুরো জেলার নেতৃত্ব নিজাম হাজারীর কাঁধে ভর করে আন্ডার গ্রাউন্ডে নিজের আয়ত্বে নিয়ে নেন নাসিম।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ফেনী জেলা শাখার সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন বলেন, আলাউদ্দিন নাসিম জোর করে অন্যের জমি দখল করে পরশুরামের চিথলিয়ায় তার নামে কলেজ নির্মাণ করেছেন। ফেনীর দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির গডফাদার ছিলেন জয়নাল হাজারী। তার পতনের পর ফেনী জেলা আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আলাউদ্দিন নাসিম। জয়নাল হাজারীর জায়গায় আসেন নিজাম হাজারী। তিনি নাসিমকে অভিভাবক বলে সম্বোধন করতেন।

২০০৯ সালের পর ফেনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাসিমকে প্রধান অতিথি করা হতো। পোস্টার-ব্যানারে লেখা থাকত ‘ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের অভিভাবক আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম’। এসব অনুষ্ঠানের বক্তারাও আলাউদ্দিন নাসিমকে ‘অভিভাবক’ হিসেবে সম্বোধন করতেন। বিগত বছর গুলোতে নিজাম হাজারী অবৈধভাবে বিভিন্ন খাত থেকে যে বিপুল অর্থ কামানোর কথা প্রচারে আছে তার একটা ভাগ আলাউদ্দিন নাসিমও পেতেন বলে জানাগেছে।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আলাউদ্দিন নাসিম আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights