জিয়া একুশে ফেব্রুয়ারির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বাতিল করেছিল

ড. সেলিম মাহমুদ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশের সংবিধান থেকে মুক্তি সংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল। সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতির পিতার নেতৃত্বে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের যে স্বীকৃতি ছিল, সেটি অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়া অসাংবিধানিকভাবে বাতিল করেছিলেন।

জেনারেল জিয়া অবৈধ সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম বাক্যে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ভাষা আন্দোলনসহ বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি অবদানের স্বীকৃতি বাতিল করেছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাঙালির জন্য আরেকটি বড় অর্জন এনে দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝায়- সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে জাতির পিতা সেটি ব্যাখ্যা করেছিলেন।
সেখানে বলা হয়েছিল, ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’ বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই সাংবিধানিক স্বীকৃতি অবৈধ স্বৈরশাসক জিয়া সংবিধান থেকে বাতিল করেছিলেন।

জাতির পিতাকে হত্যার পর এটি ছিল বাঙালি জাতির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শবিরোধী শক্তির পক্ষে ও তাদের এজেন্ট হিসেবেই জিয়া এই কাজ করেছিলেন।

৩০ লাখ শহীদের রক্তে লেখা সংবিধানকে যেভাবে ক্ষতবিক্ষত করে বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের আদর্শগুলো সংবিধান থেকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছিল, এগুলো আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে জাতিকে প্রায় ৩৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসলেও সংবিধান সংশোধনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় আওয়ামী লীগ এই কাজটি করতে পারেনি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তিন চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার আদর্শগুলো সংবিধানে পুনঃস্থাপন করে।

আবার শেখ হাসিনার উদ্যোগেই আজ একুশে ফেব্রুয়ারি সারা পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যেমন বাংলাদেশ সৃষ্টির মাধ্যমে ও বাঙালি জাতিকে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, শেখ হাসিনা ২১ ফেব্রুয়ারিকে পৃথিবীর সব জাতি, রাষ্ট্রের কাছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি একটি অনন্য অর্জন l বিশ্বে এই স্বীকৃতি কেবল বাংলা ও বাঙালিই পেয়েছে।

আজ বিএনপি ঢাক-ঢোল পিটিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করলেও তারা কি ভুলে গেছে যে, জিয়া সংবিধান থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের সব স্বীকৃতি বাতিল করেছিলেন? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়া শুধু ভাষা সংগ্রাম নয়, মুক্তি সংগ্রামের সব অর্জন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করেছিলেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার সব নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিলেন।

আজ বিএনপি যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারির কথা বলে, এটি এক ধরনের ভণ্ডামি, স্ববিরোধী অবস্থান এবং রাজনৈতিক শঠতা। আজ বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম তথা গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights