শিশুর শরীরে সিসার বিষ
জিন্নাতুন নূর
সিসাদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি দেশের সাড়ে ৩ কোটির বেশি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রার ক্ষতিকর সিসা উপস্থিত থাকার তথ্য দিয়েছে ইউনিসেফ।
সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক গবেষণায় শিশুদের খেলনা ও ব্যবহার্য দৈনন্দিন পণ্যেও উচ্চমাত্রার সিসার উপস্থিতি মিলেছে। আর এসব খেলনার সংস্পর্শে এসে কোমলমতিদের শরীরে ঢুকছে বিষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসাদূষণ একটি জরুরি পরিবেশগত স্বাস্থ্যসংকট। এর ফলে শিশুর স্নায়বিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিশুদের চঞ্চলতা বৃদ্ধি পায়, খাবারে রুচি কমে যায় এবং শারীরিক বৈকল্য দেখা দেয়। তাদের মতে, বিশ্বজুড়ে শিশুদের খেলনা কীভাবে এবং কোন ধরনের পণ্য দিয়ে তৈরি হবে তার জন্য একটি কর্তৃপক্ষ থাকলেও বাংলাদেশে এখনো এমন কিছু নেই। বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে পরিবেশে ভারী ধাতুর দূষণ বেড়েছে। এর মধ্যে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে সিসার দূষণ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে সিসার মাত্রার সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই। সাধারণত শিশুদের বাতাস, পানি, মাটি, খাবার, খেলনা, রং ও রান্নার সামগ্রীর মাধ্যমে সিসার মতো বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারী ধাতুর মধ্যে সিসা প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ওপর বেশি গুরুতর প্রভাব ফেলে। আর এই ক্ষতি চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। এর প্রভাবে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশের সময়সীমা কমে যায় এবং প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আবু সাঈদ শিমুল গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি তাদের মানসিক সমস্যা তৈরি করে। চঞ্চলতা বৃদ্ধি পায়। রুচি কমে যায়, শারীরিক বৈকল্য দেখা দেয়। গর্ভবতী মায়েদের সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু বৈকল্য নিয়ে জন্ম নেয়। সেরিব্রাল পালসি হতে পারে। ব্রেইনে সমস্যা হয়। রক্তশূন্যতাও দেখা যায় সিসার উপস্থিতির কারণে। কোন বয়সে একটি শিশু কোন ধরনের খেলনা খেলবে সেটিও ঠিক করে দেওয়ার নিয়ম আছে, যা দেশে প্রচলিত নেই। সিসা যে শুধু শ্বাসের মাধ্যমেই দেহে প্রবেশ করে এমন নয়, খাওয়ার মধ্য দিয়েও এটি প্রবেশ করতে পারে। বায়ুদূষণ এবং শিশুদের রং করার সামগ্রী থেকে তা শরীরে যেতে পারে। এজন্য খেলনা নিয়ে দেশে একটি রেগুলেটরি বডি থাকা প্রয়োজন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় শিশুদের মাস্ক পড়তে হবে। সড়কের পাশে যাদের বাসা, দিনে ঘরের জানালা বন্ধ রাখতে হবে। আর ঘরের বাইরে থেকে আসামাত্রই শিশুদের জামাকাপড় বদলে দিতে হবে। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর সঙ্গে ইউনিসেফ দেশের খুলনা, টাঙ্গাইল, পটুয়াখালী ও সিলেটে ৯৮০ এবং ঢাকায় ৫০০ শিশুকে পরীক্ষা করে সবার রক্তে সিসার উপস্থিতি শনাক্ত করে। এসব নমুনার মধ্যে চার জেলায় ৪০ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮০ শতাংশ নমুনায় প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি সিসা পাওয়া যায়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মাত্রার চেয়ে বেশি। যদিও শিশুদের রক্তে কোনো মাত্রায়ই সিসার উপস্থিতিই নিরাপদ নয়। সম্প্রতি উদ্বেগজনক এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দেশের বাজারে শিশুদের যে খেলনা বিক্রি হচ্ছে সেখানেও উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিশুদের পুতুল, বর্ণমালা সেট, স্টেশনারি ব্যাগ, পানির মগ ইত্যাদিতে সিসা পাওয়া গেছে। এসব পণ্যের উজ্বলতা বৃদ্ধি এবং তা দীর্ঘস্থায়ী করতেই শিশুপণ্যে সিসার মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু ব্যবহার করা হচ্ছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডোর এক গবেষণা প্রতিবেদনে সম্প্রতি এমনটি জানানো হয়। এর ফলে দেখা যায়, বাজার থেকে সংগ্রহ করা ২৫০টি খেলনার মধ্যে ১৫৭টিতেই সিসা পাওয়া গেছে। আর এসব খেলনায় সিসার মাত্রা ১ দশমিক ৬৮ পিপিএম থেকে ৩৭৯ পিপিএম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে ৯২টি খেলনায় সিসার পরিমাণ নিরাপদ সীমা ৯০ পিপিএমের চেয়ে বেশি।
