“একাকি নদীর গাঢ় রূপ”
হাসিনা মরিয়ম
মানুষের অনেক ত্রুটির মাঝে সবচেয়ে বড় ত্রুটি তার সীমাবদ্ধতা, যেদিকে মানুষ হাত বাড়ায় সীমাবদ্ধতা সামনে এসে দাড়ায়, কোনদিন কোনো মানুষ কি সীমা অতিক্রম করতে পেরেছে? পেরেছে কি তার কাংখিত লক্ষে পৌঁছুতে? আমি জানিনা, আর জানার আগ্রহ নেই, আমি শুধু নিজেকে জানি, আমি কি পারি কি পারিনা, আমি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারিনি, পারিনি দিগন্ত রেখাকে অতিক্রম করতে, আমি কাকে দায়ী করবো, আমাকে..? না আমার চারপাশের
স্থবিরতা কে? নাকি নিয়তিকে.. আমার জানা নেই, শুধু জানি আমি আটকে গেছি গোলকধাঁধার মাঝে যাকে দেখে মনে হয় না এর শুরু আছে না আছে শেষ, আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আমি এখানে চক্র কাটবো বেরুতে পারব না, পারবো না কখনো দিগন্ত রেখাকে অতিক্রম করতে, সীমাহীন কষ্টে আমি ডানা ঝাঁপটাবো এই গোলকধাঁধার চক্রে,আর কখনো পাখা মেলে উড়ে বেড়াতে পারব না আমার স্বপ্নের জগতে, তাজা সজীব স্বপ্নগুলো আর আমাকে স্পর্শ করবে না, শুধু আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আমি প্রানপণ চেষ্টা করবো এই চক্র থেকে বেরুতে, দিগন্ত রেখাকে স্পর্শ করতে।
কে আছে ওখানে…? কে দাঁড়িয়ে আছে..? সত্যি কেউ কি আছে..? কেউ কি অপেক্ষা করছে…? আমি কি তাকে চিনি..? জানিনা… হয়তো চিনি, হয়তো সে সত্যি হবে,হয়তোবা আমারই স্বপ্নের অবয়ব হবে, আলো ছায়ায় ওর চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না,
ও এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন..? ওকি আমার জন্য অপেক্ষা করছে..? হাসি পায় আমার, আমার জন্য আবার কে অপেক্ষা করবে, কিন্তু সে কে…. আমি বলি কে..? কোনো জবাব মেলেনি, তুমি কি আমার হৃদয়ে বাস করো..সবার অলক্ষ্যে আমি তোমাকে লালন করি আমার মাঝে, তুমি সামনে আসো, তোমার দুটি হাত মেলে ধরো আমার দিকে, আমি তোমার হাত ধরে এই গোলকধাঁধার সীমাহীন যন্ত্রণাদায়ক চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে চাই,এখনও ওর জবাব মেলেনি, অভিমান করেছো আমার সাথে..? তুমিও আমাকে বুঝবে না..? বারবার ডানা ঝাপটিয়েছি এখান থেকে বের হবার
জন্য কিন্তু ওরা আমাকে আটকে রেখেছে, বেরুতে দেয়নি, ওরা কারা… ওরা… আসলে ওদের আমিও চিনিনা, এতোগুলো চেহারা ওদের, কোনটা আসল কোনটা নকল বুঝতে পারিনি, জানো মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের চিনি, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের কখনো দেখিনি, আসলে ওরা সবসময় মুখোশ পড়ে থাকে, তাই ওদের চেহারাটা আজও দেখা হয়নি আমার, কিন্তু তুমিতো আমার আপন,আমার মাঝে বাস করো, তুমি কেন আড়ালে আলো আঁধারীতে দাঁড়িয়ে আছো..? তুমি জানো না তোমাকে আমি পলপল অনুভব করি আমার মাঝে…, আমার কষ্ট দেখতে তোমার ভালো লাগছে,আমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও সেখানে যেখানে কাশফুলের আলতো পরশে এক অদ্ভুত অবশ অনুভুতি ছড়িয়ে পড়বে আমাদের দুজনের মাঝে, সারি সারি বলাকা উড়ে যাবে দিগন্ত রেখার দিকে, তুমি আর আমি শুধু, আমাদের চারপাশে কেউ নেই, প্রকৃতির মাঝে আমরা দুজন যেন নতুন পৃথিবীর মানব মানবী,
নদীর পাড় ঘেঁষে বিস্তীর্ণ মাঠ পেরিয়ে আমরা হেটে হেটে যাবো আমাদের ছোট্ট মাটির কুটিরে, তোমার দুটি চোখ ভরে থাকবে আমাকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, আর বুক ভরা ভালোবাসা,তুমি বারবার বলবে এই পৃথিবীতে তুমি আমার জন্য এসেছো……
আর ভাবতে পারছি না চোখ ভিজে আসছে আমার, আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আমি শুধু এইতো চেয়েছি ভালোবাসা, কিন্তু আমার চারপাশের ওরা?
মুখোশধারীরা…? আমার ভালোবাসা নিয়ে খেলা করেছে, নিষ্ঠুর হোলিখেলা, রক্তাক্ত করেছে আমাকে প্রতিনিয়ত,বারবার মুক্তি চেয়েছি মুক্তি মেলেনি, আরো কঠোর থেকে কঠোর হয়েছে ওরা, বারবার আমি তোমাকে স্পর্শ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি পারিনি, ওরা আমায় এখানে আটকে রেখেছে, আমি জানিনা আমি বেরুতে পারবো কিনা, নাকি তুমি আদি থেকে অনন্তকাল ঐ দিগন্তরেখার ওপারে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, তুমি..হ্যাঁ তুমি, আমার ভালোবাসা,যাকে আমি খুঁজছি আদি থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত, পাইনি, শুধু অনুভব করেছি,তুমি আছো কোথাও, কিন্তু কোথায়… আমি জানতে পারিনি, হয়তো আমার পাশে আছো, আমি চিনতে পারিনি, কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব, আমি তোমাকে চিনবো না? আমি তো তোমাকে জনম জনম ধরে চিনি, তুমি তো আমারই
মাঝে বাস করো,শুধু তোমাকে সেভাবে দেখা হয়নি, আসলে তোমাকে দেখতে পারিনি, ওরা দেখতে দেয়নি,ঐ যে মুখোশধারীরা, ওরা আমাকে তোমার কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে, আটকে রেখেছে ওরা আমাকে এই অন্ধকারে গোলক ধাঁধার মাঝে, বারবার আমি যেতে চেয়েছি তোমার কাছে, বেরুতে চেয়েছি এখান থেকে, কিন্তু ঘুরে ঘুরে আবার এই বৃত্তে এসে দাঁড়িয়েছি, আমার চোখ ভিজে আসছে বোবা কান্নায়, কিন্তু আমার চোখের জল ওদের স্পর্শ করেনি, বারবার বলেছি আমাকে আলোতে যেতে দাও, আমাকে বেরুতে দাও, কিন্তু কেউ ছিলো না আমার কথা শোনার মতো, আমি একা আর আমার সাথে নিকষ অন্ধকার, নিষ্ঠুর দেয়ালগুলো হাতড়ে হাতড়ে আমি বারবার বেরুতে চেয়েছি,পারিনি….. সেকি! তোমার চোখ ভিজে আসছে কেন? আমি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সব অন্ধকার সহ্য করবো কিন্তু তোমার চোখের জল আমি সহ্য করতে পারবো না, তাহলে আমি আর এক পা-ও এগুতে পারবো না, আমি নিঃশেষ হয়ে ভেঙে পড়বো,বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকু আমি হারিয়ে ফেলবো,তুমিইতো আমার বেঁচে থাকার প্রেরনা,আমিতো প্রতিনিয়ত আশায় বুক বাধি তোমার কাছে আসবো বলে, আমাকে আসতেই হবে, আমার ভালোবাসার কাছে, একটু একটু করে শক্তি সঞ্চয় করে আমি আসছি তোমার দিকে, আমি জানি তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছো দিগন্তের ওপারে, যখনই তোমার কথা ভাবি তখনই আমার বেঁচে থাকতে খুব ইচ্ছে করে, জীবনকে মনে হয় খুব সুন্দর, কি সুন্দর এই অনাবিল বেঁচে থাকা…, সারা শরীরে শিহরণ খেলে যায়, চোখ বন্ধ করে আমি তোমাকে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা করি, হাতরাতে থাকি চারপাশ..তোমাকে দেখিনা,শুধু আবছা ভাবে তোমার অবয়বটা দেখতে পাই আলো
আঁধারীতে.., অস্থির হয়ে যাই তোমাকে এক নজর দেখার জন্য, পাগলের মতো ছুটোছুটি করি এদিক থেকে ওদিক,
ওহ্ মাগো…কংক্রিটের দেয়ালে মাথাটা ঠুকে গেছে, একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বসে পড়ি দেয়াল ঘেঁষে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবটুকু বাতাসে ও আমার হৃদপিণ্ড ভরবে না, ক্লান্তি অবসাদে হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকি শক্ত মেঝেতে, শুধু অস্পষ্টভাবে দূরে থেকে কেউ যেন ডাকছে…. এসো..এসো…তখনই খুট করে দরজাটা খুলে যায়,
এক পশলা বৃষ্টির মতো আলো এসে ঝাপটা মারে মুখে,, আলোর তীব্রতা আমি সহ্য করতে না পেরে চোখ ঢেকে ফেলি, ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগে আমার, আস্তে আস্তে আলোটা সয়ে আসে চোখে,আমি আস্তে আস্তে চোখ খুলি,সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখতে পাই, আচ্ছা ওর কয়টা চেহারা… তুমি জানো….? এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটা আসল না মুখোশ…?
-খাবার খেয়ে নিন,
ওর কথায় ধাক্কা খেলাম আমি, আমি ভালো করে খুটিয়ে খুঁটিয়ে ওকে দেখছি,বুঝতে পারছি না। আসল না নকল… -কই খেয়ে নিন, ঔষধ খেতে হবে,
-খাবো না খিদে নেই এগুলো এখান থেকে নিয়ে যাও কেমন বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে, আরেকটু দেরি করলে আমি বমি করে দিবো,
-সেকি নিচ্ছেন না কেন..?
ওহ্ খোদা… আমিতো এতোগুলো কথা মনে মনে বলেছি, ও কিভাবে শুনবে, আমি বারবার প্রানপনে মুখে বলার চেষ্টা করছি পারছি না, আচ্ছা তুমি কি আমার কথা শুনতে পাও? বোধহয় তুমি ও আমার কথা শুনতে পাও না,শুনলে তো তুমি আমাকে এই নরক থেকে নিয়ে যেতে,
–আচ্ছা তুমি কি আমাকে দেখতেও পাও না..? এখন বুঝতে পারছি কেন তুমি আসছো না,কারণ তুমি তো জানোই না আমি কোথায় আছি, শুধু আমি জানি তুমি কোথায় আছো..দিগন্তের ওপারে… আমি শুধু তোমাকে আলো আঁধারী ছায়ায় আবছা ভাবে দেখতে পাই,
চোখ ভিজে আসে কান্নায়, আর কতদিন বয়ে বেড়াবো এই বেঁচে থাকার গ্লানি, আর কতকাল আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য, তুমি আসবে.. এখান থেকে আমায় নিয়ে যাবে…., —কি হলো খেয়ে নিন, ওর কথায় আবার আমি খাবারের দিকে তাকালাম, ছিঃ এগুলো খাবার …? স্বাদহীন,বর্ণহীন, গন্ধহীন…? খাবার থেকে কি মৌ মৌ গন্ধ আসে, মনে হলেই জিভে পানি চলে আসে, আর এগুলো কি…..আমি খাবার থালা ঠেলে দূরে সরিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলাম,
——আপনাকে খেতে হবে না হলে ঔষধ খাবেন কিভাবে..,
মনে মনে বললাম..
তুই খা শাঁকচুন্নি, সব খাবার তুই খা,ঔষধ ও তুই খা, তারপর বাঁদর নাচ,
—নিন খেয়ে নিন,
-ওহ্…
—ডাক্তার আসলে আপনাকে খেতে হবে, একটু খেয়ে নিন,
আমি মেয়েটার কথা অগ্রাহ্য করে মেঝেতে হাত পা গুটিয়ে শুয়ে পড়লাম, ক্লান্তি আর অবসাদে শরীর ভেঙে আসতে চাইছে, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, প্রানপন চেষ্টা করছি চোখ খোলা রাখতে যাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে তোমাকে একটু দেখতে পাই, কিন্তু না পারলাম না, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম……
–সিষ্টার মেয়েটা কিছু খেয়েছে.. ঔষধ দিয়েছেন? -স্যার ওনাকে কিছু খাওয়াতে পারছি না, ঔষধ ও নিচ্ছে না, এই দেখুন ঘুমিয়ে পড়েছে, আজকে এতোদিন ধরে দেখছি আর অবাক হচ্ছি, না কিছু খাচ্ছে না কথা বলছে, মেয়েটার কি হয়েছে আর ওর নাম ই বা কি……
—-জানিনা, আজ সতের দিন মেয়েটা এখানে এসেছে, শুরুতে ওর জ্ঞান ছিল না, ধীরে ধীরে ওর জ্ঞান ফিরে আসে কিন্তু কথা বলতে ভুলে গেছে, ওর আতংকিত বিবর্ন চেহারাটা
আমাকে কষ্ট দেয়, গভীর মমত্ববোধ করি ওর জন্য, প্রানপন চেষ্টা করছি ওকে বাঁচিয়ে রাখতে, কিন্তু মেয়েটা কোনো কো-অপারেট করছে না, আমি জানিনা ওকে আমি বাঁচাতে পারবো কিনা….. -ওনার কি হয়েছে…
–ধর্ষণ.. অনেকগুলো লোক মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে,ওকে একটা ঘরে ওরা আটকে রেখেছিল দিনের পর দিন, ওদের লালসার চিহ্ন মেয়েটি বয়ে বেড়াচ্ছে ওর সারা শরীরে, রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় দুইজন রিকশাওয়ালা ওকে নিয়ে আসে, একটা নির্জন ঘরে ঘোঙানীর আওয়াজ শুনে ওরা এগিয়ে যায়,সেখানে মেয়েটিকে ওরা ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় পায় এবং এখানে নিয়ে আসে…
—কি নিষ্ঠুরতা… কেমন করে পারলো… মেয়েটার নিষ্পাপ মুখ দেখে ওদের মায়া লাগেনি…? –ওদের মায়া লাগলে এভাবে মেয়েটাকে আটকে রাখতো না,ওরা পশুকে ও হার মানায়….
—-ডাক্তার…. মেয়েটিকে সালাইন পুশ করা যাচ্ছে না, খুলে ফেলে,
—-ওকে মুখে খাওয়ান,ওকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করুন বলে ডাক্তার চলে গেল,
সিষ্টার মেয়েটার কাছে গেল, কি করুণ নিষ্পাপ একটা মুখ, সমস্ত চেহারায় শিশুর মতো সারল্য, বুকটা ভরে যায় গভীর মমতায়, আহারে….. কি জানি ওর কি নাম, কার মেয়ে, কোথা থেকে এসেছে, সিষ্টার মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, অঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি,ক্লান্ত, বিষন্ন, অবসন্ন একটা শরীর, শরীর বললে ভুল হবে, ক্ষত বিক্ষত মাংস পিন্ড, হায় খোদা…মেয়েটিকে বাঁচতে সাহায্য করো,তারপর দরজাটা ভেজিয়ে সিষ্টার চলে যায়, প্রচন্ড কাঁপুনি দিয়ে জেগে উঠে মেয়েটি,জ্বর আসছে, কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল জানেনা জেগে উঠে ও বারবার কুঁকড়ে উঠছে, দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে,শীত… শীতে কাপছে শরীর, উঠে দাঁড়াবার শক্তি নেই মেয়েটির উঠে বসার চেষ্টা করে, নাহ..বসে থাকতে পারছে না, শরীরটা হেলে পড়ে মেঝেতে, দূর… অনেক দূর থেকে মনে হচ্ছে সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছে, আবছা ভাবে ও নিজেকে সমুদ্রের বেলাভূমিতে হাটতে দেখছে…. কি সুন্দর.. কি অপূর্ব.. সবকিছু আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে ওর সামনে থেকে, ধীরে ধীরে অন্ধকার গ্রাস করে ওকে, জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও .. কতক্ষণ এভাবে ছিল জানেনা… সিস্টার ঘরে ঢুকে ওর গায়ে হাত দিয়ে চিৎকার করে ডাকে.. ডাক্তার.. ডাক্তার.. মেয়েটি মারা যাচ্ছে.. তাড়াতাড়ি আসুন, ওর পালস্ পাচ্ছি না…ডাক্তার দৌড়ে
আসেন,ওর পালস্ দেখেন,
অত্যান্ত দূর্বল ভাবে মেয়েটির পালস্ উঠানামা
করছে,
ডাক্তার বললেন বেঁচে আছে, কিন্তু মেয়েটার প্রচন্ড জ্বর,ওকে বেড এ শোয়ান,গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিন, মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করুন, আর তাড়াতাড়ি স্যালাইন পুশ করুন,মেডিসিন এর সাথে ঘুমের ঔষধ দিয়ে দিন যেন ঘুমিয়ে পড়ে, তা না হলে স্যালাইন খুলে ফেলবে, শরীরে ঔষধ খাবার যাওয়া জরুরি, তা না হলে মেয়েটাকে বাঁচানো যাবে না, যেভাবে হোক আমি চাই মেয়েটা
বেঁচে থাকুক,
সিস্টার তাড়াতাড়ি করুন, জ্বী বলে কাজে লেগে গেল সিস্টার, ডাক্তার মেয়েটার পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে,সিস্টার মাথায় পানি ঢালছে,ডাক্তার মেয়েটির পাশে বসে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে, সমস্ত চেহারায় বিষাদের ছায়া, কতো দূঃখী মেয়েটিকে ও..আর কোথা থেকেই বা এসেছে… আর এই নির্জন বাড়িটাতে মেয়েটি এলো কিভাবে.. জানতে হবে সব জানতে হবে, কিন্তু কিভাবে জানবে, মেয়েটাতো কথা বলছে না, আর রিকশাওয়ালাদের ঠিকানা ও তার কাছে নেই, তাহলে কিভাবে সম্ভব… সম্ভব.. ডাক্তার ঠিক করে পুলিশকে জানাবে, পুলিশ খুঁজে বের করবে ক্রিমিমালদের,ডাক্তার পুলিশকে ফোন করলো, দুদিন দু-রাত যমে মানুষে টানাটানি করে মেয়েটি মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এলো,সকালের নরম রোদ ওর মুখে পড়তেই ও ধীরে ধীরে চোখ
খুললো, তাকিয়ে রইলো জানালার বাইরে নিম গাছটার দিকে, সিস্টার দৌড়ে বের হয়ে গেল রুম থেকে, ডেকে নিয়ে এলো ডাক্তারকে —-ডাক্তার মেয়েটির জ্ঞান ফিরেছে,
ডাক্তার এসে দেখেন মেয়েটি তাকিয়ে আছে নিম গাছের দিকে দুটি চড়ুই পাখি উড়ে উড়ে এ ডাল থেকে ও ডালে যাচ্ছে, তাই দেখছে মেয়েটি গভীর ভাবে, ডাক্তার মেয়েটির পাশে এসে দাঁড়ালো, ওর কপালে হাত দিয়ে দেখলো,জ্বর নেই,
এখন কেমন বোধ করছেন, বাপরে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন, এখন ভালো লাগছে আপনার….মেয়েটি কোনো সারা দিচ্ছে না,সেভাবেই তাকিয়ে আছে বাহিরে, ডাক্তার সিস্টারকে বললেন খেয়াল রাখবেন কোনো ভাবে যেন স্যালাইন খুলতে না পারে, বলে ডাক্তার চলে গেলেন, নার্স মেয়েটির কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, বললেন
এখন কেমন লাগছে আপনার, মেয়েটি ঘুরে তাকালো কিছু বললো না, জানালা দিয়ে বাইরে নিম গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলো, নার্স আবার বললেন
—খেতে ইচ্ছে করছে..? কিছু খাবেন..?এনে দিবো..? মেয়েটা কোনো জবাব দিলো না, চোখ বন্ধ
করে শুয়ে রইলো, মায়ের মুখটা আবছা ভাবে ভেসে উঠছে চোখের সামনে, মার হাসি হাসি
মুখ,মা যেমন করে বলতেন
-খুকু কি খাবি… কি খেতে ইচ্ছে করে তোর… নাড়ু খাবি বানিয়ে দিবো…, বুকটা ভেঙে আসতে চাইছে কান্নায়,অস্ফুট স্বরে বললো….. মা….. মাগো… তুমি কোথায়…., সেই দিন সেই রঙে ভরা দিনগুলো,প্রজাপতির মতো রঙিন পাখা মেলে ঘুরে বেড়ানো, সারাক্ষণ হইচই করা, মাতাল হাওয়ায় ছুটোছুটি করা সেই সব দিন কোথায় হারিয়ে গেল…কেন হারিয়ে যায়…. কি থেকে কি হয়ে গেল, জীবনটা কেমন যেন বদলে গেল এক ঝটকায়, সবাই মিলে শরীরে একটা লাল শাড়ি জড়িয়ে দিয়ে বললো আজ খুকুর বিয়ে, বিয়ে….. বিয়ে কি তাই জানতে দিলো না, বিয়ে হলে কি হয়,বিয়ে কিভাবে হয়, কোনো কিছুই না, ব্যস শুধু বললো আজ বিয়ে আর বিয়ে হয়ে গেল এক কিশোরীর এক যুবা পুরুষের সাথে, অসম এক বিয়ে, মেয়েটা তাকে চিনেনা, জানেনা, কোনোদিন কথা পর্যন্ত বলেনি, এক কথায় বিয়ে….., এটা কিভাবে সম্ভব…? বড়োরা চাইছে বলেই….? বড়োরা চাইলে সব সম্ভব..? আমি কেঁদে ফেললাম, বললাম আমি বিয়ে করবো না, ঐ লোকটাকে আমি বিয়ে করবো না, ছিঃ কি বিচ্ছিরি… আমি যাবো না ঐ লোকটার সাথে, সাথে সাথে আমার ডিক্টেটর বাবা হুঙ্কার দিয়ে বললেন..
—- বিয়ে করতে হবে, যেতে হবে, আমি ভয়ে ভয়ে বললাম
কেন যাবো… বাবা হুঙ্কার দিয়ে বললেন আমি বলছি তাই… বাবাকে আমি সবসময় জমের মতো ভয় পাই,কখনো ওনার সামনে দাঁড়াতে পারিনি, আজও পারলাম না, পায়ে পায়ে পিছিয়ে এলাম,ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠলাম,গাড়ি ছুটে চললো,এক কিশোরী তার স্বপ্নগুলোকে কবর দিয়ে সামনে এগুতে লাগলো, সামনে কি অপেক্ষা করছে ওর জন্য…? ছোট্ট শরীরটা ভয়ে জমে যেতে লাগলো, পাশে বসা লোকটাকে আড়চোখে দেখলো ও,লোকটা সিগারেট ধরাচ্ছে, মুচওয়ালা..ছিঃ কি কুৎসিত লাগছে লোকটাকে, আমি ভয়ে কান্না শুরু করে দিলাম, লোকটা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো
আহা কান্নার কি আছে, চুপ করে বসো, আমার কান্না যেন থামছেই না, আমি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম, কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম ….. মানুষের কোলাহলে ঘুম থেকে জেগে উঠি আমি, চোখ মেলে তাকালাম, চারিদিকে লোকজন আমাকে দেখে হাসছে আর
বলছে…..
বউ আসছে বউ আসছে.. আমি ভয় পেয়ে গেলাম, পানির পিপাসায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, কার কাছে পানি চাইবো, কাউকে চিনি না, বুড়ো মতো এক মহিলা বললো..
–ওরে ছোটন বউকে কোলে নিয়ে ঘরে
আয়, আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছে ঐ লোকটা এগিয়ে এলো, আমি আরো সেধিয়ে গেলাম পিছনে ভয়ে, লোকটা এক ঝটকায় পাজা কোলে করে আমাকে নিয়ে দোতলায় উঠে গেল, যেন একটা পাখির ছানাকে নিয়ে সে উঠলো,সাজানো একটা ঘরে সে আমাকে রেখে চলে গেল, সবাই আমাকে নিয়ে মজা করতে লাগলো, আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না, আমারই মতো একটা মেয়ে
আমার পাশে এসে বসলো, আমাকে অবাক হয়ে
দেখছে,আমাকে জিজ্ঞেস করলো….
—-তোমার নাম কি..আমি বললাম…. –আমার নাম দিলশাদ,তবে সবাই আমাকে খুকু বলে ডাকে, আমি ওকে বললাম
—তোমার নাম কি..ও বললো –শাহানা.. আমি বললাম
— শাহানা, আমাকে তুমি পানি খাওয়াতে পারো,আমার গলা শুকিয়ে গেছে, শাহানা বললো -এক্ষুনি নিয়ে আসছি,ও পানি নিয়ে এলো, আমি তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো এক টানে পানিটা খেয়ে নিলাম…
রাত যতই বাড়ছে লোকজন ততই আসছে, সবাই বউ দেখতে আসছে, আমি আর বসে থাকতে
পারলাম না, কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম, এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম, কতক্ষণ ঘুমালাম জানি না,বুড়ো মতো এক মহিলা আমাকে জাগিয়ে দিল,বললো —-ও কনে বউ উঠো, খাবে না, খেতে এসো, আমি মাথা নাড়লাম খাবো না, উনি বললেন না না উঠো খেতে হবে, না খেলে শরীর খারাপ করবে, এক রকম জোর করে উনি আমাকে খাওয়ালেন, আমি খেয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম, ক্লান্তিতে সারা শরীর ভেঙে আসতে চাইছে, কাপড় পর্যন্ত বদলাতে পারলাম না, ঘুম নেমে এসেছে আমার দুচোখ জুড়ে, কতক্ষণ ঘুমালাম জানি না, ধাক্কা ধাক্কিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল, চোখ মেলে তাকালাম দেখি আমার স্বামী আমাকে ডাকছে, বললো কতো ঘুমাও যাও কাপড় বদলে আসো,একরাশ বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে আছে, আমি ভয়ে ভয়ে উঠে বাথরুমে কাপড় বদলাতে গেলাম, কাপড় বদলে আমি ঘরে এসে দেখি উনি শুয়ে আছেন আমার বিছানায়, আমি বললাম….. —–আপনি এখানে শুইলে আমি শোবো কোথায়..? আপনি উঠেন বাইরে যান, আমি শোবো, লোকটা
অবাক হয়ে বললো,
–বাইরে যাবো মানে…? এটা আমার ঘর, আমার বিছানা, আমি বাইরে যাবো কেন..? তাছাড়া তুমি আমার স্ত্রী, তুমি আমার সাথে শোবে, এসো ঘুমাতে এসো,আমি বললাম
না আমি আপনার সাথে শোবো না, বলে সোফায় শুয়ে পড়লাম, লোকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো, কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এসে হাত ধরে টানতে লাগলো বললো
—শুতে আসো বাড়াবাড়ি করবে না, আমার একদম পছন্দ না বাড়াবাড়ি, চুপ করে শুয়ে পড়ো,আমি এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম, ভয়ে কান্না শুরু করে দিলাম, লোকটা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো
কান্নার কি আছে, এ-সব নাটক বন্ধ করো,রাত অনেক হয়েছে, চুপচাপ শুয়ে পড়ো, আমি নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম, লোকটা অনেক ধাক্কা ধাক্কি করলো, আমি কিছুতেই দরজা খুললাম না, কাঁদতে লাগলাম, এ ক সময় ধাক্কা ধাক্কি বন্ধ হলো, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন ভোর হবে, আমি বাড়ি যাবো, স্কুলে যাবো, নুরী,মিনি,আনু, ওরা কেউ জানেনা আমার বিয়ে হয়ে গেছে, ওদের সব বলবো, কেমন করে আমার বিয়ে হয়েছে, ব্যস, সকাল হোক, সকাল হলেই বাড়ি চলে যাবো, আর কখনো এই বাড়ি আসবো না,এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, দরজা ধাক্কায় আমার ঘুম ভেঙে গেল, দেখি সবাই ডাকছে,
বউমা দরজা খোলো, জানালা দিয়ে ভোরের আলো আমার চোখে মুখে পড়তে লাগলো, আমি বুঝলাম ভোর হয়ে গেছে, দরজা খোলা যায়, বাড়ি যেতে হবে, আর সবাই জেগে উঠেছে, এখন আর আমার কোনো ভয় নেই, লোকটা আমাকে আর কিছু করতে পারবে না,আমি ধীরে ধীরে দরজা খুলে দিলাম, সবাই অবাক হয়ে আমাকে দেখছে, কেউ কেউ বলছে কেমন বউ… রাতভর বাথরুমে বসে রাত কাটিয়ে দিলো, স্বামীর কথা চিন্তা ও করলো না..আমি কোনো কথার জবাব দিলাম না, শুধু বললাম
—আমি বাড়ি যাব, আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন,সবাই অবাক হয়ে আমার কথা শুনছে, কেউ কেউ বলছে…
—-এই মেয়ে বলে কি….বলি এটা তোমার স্বামীর বাড়ি, এখান থেকে কোথায় যাবে তুমি… এ্যা…? এখানেই তোমাকে থাকতে হবে, আমি বললাম —না আমি এখানে থাকবো না, আমাকে আমার বাবা মায়ের কাছে আমার বাড়ি পাঠিয়ে দিন,এতোক্ষণ লোকটা কিছু বললো না, এখন হুঙ্কার দিয়ে উঠলো, বললো
—বাড়ি যাবে.. বিয়ের আগে মনে ছিলো না…? সবাই চলে যান,দরজা বন্ধ করে আটকে রাখলে তখন সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি করুণ সুরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম
—আমাকে যেতে দিন, আমি বাড়ি যাব,কেউ আমার কথা শুনলো না, সবাই বোঝাতে লাগলো, এখন থেকে এটাই তোমার আসল বাড়ি, স্বামীর বাড়ি মেয়েদের আসল বাড়ি, আমি মেনে নিলাম না, যেখানে আমি বড়ো হলাম, আমার ছেলেবেলা কাটলো,স্কুলে গেলাম, যে আলো বাতাসে আমার কৈশোর কাটলো, যে বাড়ি আমার চিরচেনা সেই বাড়ি এক ঝটকায় পর হয়ে গেল…? আর এই অচেনা অদেখা এই বাড়ি, আর এই বাড়ির মানুষ সব আপন..?আর ঐ মুচওয়ালা আমার স্বামী…. ? আমি মেনে নিলাম না, আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য অনড় হয়ে বসে রইলাম, কিন্তু হায়.. কেউ আমার কথা শুনলো না,সবাই আমাকে চোখে চোখে রাখলো, জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাবা কখন আসবে,কেউ আসে না, দিন যেমন তেমন ভাবে কেটে যায়, কিন্তু যখনই রাত আসে, অন্ধকার থাবা মেরে বসে চারিদিকে, তখন আমি ভয়ে কুঁকড়ে যাই,হাহাকার করে উঠে মন,কি করবো, কোথায় যাব,কেমন করে পালাবো, কিছুই তো চিনি না, ঐ লোকটাকে আমার দৈত্যের মতন মনে হয়, চোখ দুটো লালসায় চকচক করে, জিভটা মনে হচ্ছে ঝুলে আছে কুকুরের মতো, অবিরাম লালা ঝরছে জিহবা থেকে, হে খোদা… আমাকে এই লোকটার হাত থেকে বাঁচাও, এক্ষুনি আমাকে খুবলে টেনে হিচড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে,আজ আবার আমার প্রতি দিনকার মতো মৃত্যু হবে, তারপর আবার আমাকে বাঁচিয়ে তোলা হবে, হে খোদা… আমাকে সাহায্য কর,
অন্ধকার ছাড়া আমার জীবনে কিছু নেই, কিভাবে বেঁচে আছি জানি না, একদিন সত্যি সত্যি মুক্তি মিললো, বাড়িতে তেমন কেউ ছিল না, আমি করিডোর এ এসে দেখি কেউ নেই, আস্তে আস্তে দোতলা থেকে নীচে নেমে এলাম, কাউকে দেখলাম না,তারপর গেটের কাছে এসে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, নাহ কেউ নেই, দুপুরের এই সময়টা বাড়ি প্রায় নিঝুম থাকে, আমি ধীরে ধীরে গেট খুলে বাইরে চলে এলাম,বাইরে এসে একটা ধাক্কা খেলাম, কোন দিকে যাবো, আমাদের বাড়ি কোন দিকে, কিছু চিনি না, শ্রান্ত, ক্লান্ত শরীর ভেঙে আসতে চাইছে,পা চলছে না, তারপর ও টেনে টেনে চলছি,হাটছি তো হাটছি…একি কোথায় যাচ্ছি আমি.. বাড়ি ঘর নেই, সামনে কবরস্থান, তার পাশ দিয়ে রাস্তা, রাস্তা দিয়ে দূরে তাকালে একটা বালুর মাঠ,দূরে আবছাভাবে কিছু বাড়ি দেখা যাচ্ছে, আমি আস্তে আস্তে ঐ বাড়ি গুলো লক্ষ্য করে হাঁটছি কবরস্থান পেরিয়ে মাঠে নামলাম, দু- একজন মানুষ রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে এদিক থেকে ওদিকে, আমি এলো মেলো পা ফেলে হাটতে লাগলাম, মাঠের শেষ মাথায় একটা ঘর মতো দেখা যাচ্ছে, ভাবছি ওখানে যেয়ে একটু জিরিয়ে নিবো,তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে আমি ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ালাম,দরজায় আস্তে ধাক্কা দিলাম, দরজা খুলে গেল, ভেতরে উঁকি দিলাম, কেউ নেই, কিছু চেয়ার, বেঞ্চ, আর একটা টেবিল, কোনায় একটি কলসিতে পানি রাখা আছে, আমি কলসির কাছে গেলাম, গ্লাস ভর্তি করে পানি খেলাম, শরীরের ক্লান্তি কিছুটা দূর হয়েছে, সূর্য হেলে পড়েছে মাথার উপর, আমার ভীষণ ভয় করতে লাগলো, কোথায় যাব, এমন নির্জন একটা ঘর, এখানে কে থাকে, আমি বাইরে উঁকি দিলাম, এখান থেকে ঝিলের পাড় ধরে সামনে এগুলেই বাড়ি ঘর দেখা যাচ্ছে, আমি ঠিক করলাম একটু জিরিয়ে নেই, তারপর আবার হাঁটবো, একটা বেঞ্চের উপর আমি লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম, আর সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘুমিয়ে গেলাম,
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, মানুষের ফিস ফিসানিতে ঘুম ভেঙে গেল আমার, চোখ মেলে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম, কতোগুলো মুখ আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে, ওদের মুখ ভর্তি দাত,ওরা সব দাঁত বের করে আছে, আমি
বললাম..
আপনারা কারা..ওরা বললো
-তুমি কে..আমি বললাম —আমি বাড়ি যাবো, একজন বললো কোথায় তোমার বাড়ি…
–কলকাতলা….
কলকাতলা…এটাতো ঐ দিকে, তুমি এদিকে কেন আসছো,এটাতো কলকাতলার রাস্তা না.. আমি উঠে দাঁড়াতেই একজন আমার হাত ধরে বললো, -এখন কিভাবে যাবে, রাত হয়ে গেছে, ভোর হোক তোমাকে আমরা পৌঁছে দিব,বলে টান দিয়ে আমাকে বসিয়ে দিলো, আমি জড়োসড়ো হয়ে ঘরের এক কোনায় বসে পড়লাম, ওরা সবাই হাসছে, আমি আরো কুঁকড়ে গেলাম, ভাবছি কেমন করে এখান থেকে বের হবো, ওরা নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লো, ইনজেকশন, সূই, সিরিঞ্জ, কি সব বের করতে লাগলো, তারপর যে যার শরীরে পুশ করতে লাগলো, আমি আর্তনাদ করে উঠলাম,ওরা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো, আমার গা কাটা দিয়ে উঠলো,
সেকি..ওরা এদিকেই আসছে, ওদের প্রত্যেককে আমার দানবের মতো লাগলো, আমার শরীর শিউরে ওঠলো,ওদেরকে আমার মানুষ মনে হচ্ছে না, আমি শুধু বললাম.. —আমাকে যেতে দিন, আর কিছু মনে নেই
আমার, যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন নিজেকে এখানে আবিষ্কার করি, আমি জানি না আমার মা কোথায়, আমার বাড়ি কোথায়, আমার শৈশব কোথায় ফেলে এসেছি…
—-নার্স স্যালাইন শেষ হয়েছে,….
-না স্যার আর একটু আছে, কোনো ডিস্টার্ব করেনিতো.. —না ঘুমিয়ে ছিল,
good, ঘুম ওর জন্য খুব দরকার, মেয়েটা কথা বলেছে,
–না বলছে না, ডাক্তার মেয়েটার ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছে না,
ঔষধ না নিলে বন্ধ হবে কেমন করে, খাবে না, ঔষধ নিবে না,ঔষধ নিক, সব ঠিক হয়ে যাবে,ওকে তো কোনো টেস্ট করতে পারছি না, কি সমস্যা, শরীরের কোথায় কি হয়েছে, আগে দেখতে হবে, আমরা তো প্রাথমিক ঔষধ দিয়েছি, আগে বাঁচুক, একটু সেরে উঠুক,তারপর পুরো শরীর চেক করবো,কিন্তু মেয়েটাতো আমাদের সাথে কো- অপারেট করছে না, ডাক্তার চলে গেল, আমি ধীরে ধীরে চোখ খুললাম,নিম গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম,চড়ুই পাখি দুটো নেই, কোথায় যেন চলে গেছে, আমি উঠে বসলাম, নার্স আমাকে দেখছে, বলছে…
-এখন ভালো লাগছে আপনার, আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম, মুখটা বিস্বাদ লাগছে, হাত থেকে টেনে স্যালাইন খুলে ফেললাম, নার্স দৌড়ে এলো -সেকি… খুলছেন কেন.. আপনার ভালো হতে ইচ্ছে করে না.. আমি মনে মনে বললাম, না করে না, ভালো হয়ে আমি কোথায় যাব… কে আছে আমার.., আমার চারপাশে কেউ নেই, আমি কারো কাছে যেতে চাই না, আমি ওর কাছে যাব, যার মুখটা আমি দেখিনি, দিগন্তরেখার ওপারে যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমি ওর কাছে যাব,আমি আবার গুটি সুটি মেরে শুয়ে পড়লাম, নার্স আমার গায়ে কম্বল তুলে দিলো,তারপর দরজা বন্ধ করে চলে গেল,
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, মনে হচ্ছে বহু দূর থেকে কেউ আমাকে ডাকছে, — উঠুন, উঠুন বলে গায়ে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে নার্স, আমি চোখ মেলে তাকালাম, দেখি দুজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, পাশে ডাক্তার দাঁড়িয়ে, পুলিশ আমাকে জিজ্ঞেস করছে.. -আপনি কোথা থেকে এসেছেন, ডাক্তার বললেন —আমি তো আপনাকে বলেছি উনি কোনো কথা বলছেন না, পুলিশ বললো
—-আপনি ব্যস্ত হবেন না আমি দেখছি, আমি রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই প্রশ্ন করবো,তারপর আমার দিকে ফিরে বললো –প্লিজ বলুন আপনি কোথা থেকে এসেছেন,আপনার নাম কি… তাইতো.. আমি কোথা থেকে এসেছি, আমার নাম কি.. উত্তর থেকে না দক্ষিণ থেকে, নাকি দিগন্ত রেখার ওপার থেকে, কোথা থেকে এসেছি আমি…. আমি কি শুধু চলছিই…আমার শেষ কোথায়… কোথা থেকে শুরু করেছি আমি… আর এখানেই বা কিভাবে এলাম,আমার চারপাশে ওরা কারা…আর কেন আমাকে এতো প্রশ্ন করছে, আমি তো জানি না আমি কোথা থেকে এসেছি,ঐ যে ঐ বাড়িটা…ওটা কাদের বাড়ি… ঐ বাড়ির নাম কি.. ওখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল তাইতো চলে এসেছি,কিন্তু ঐ যে ঐ লোকগুলো যারা আমার সমস্ত শরীর ক্ষত বিক্ষত করেছে, ওরা কারা…. পলপল আমি ব্যথায় নীল হয়ে যেতাম, কেন ওরা আমার শরীরটাকে ক্ষত বিক্ষত করেছে… আমি তো ওদের কোনো ক্ষতি করিনি তবে কেন…… —আপনি কথা বলুন, না বললে কিভাবে জানবো,আপনি কে… কোথা থেকে এসেছেন, আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছি, না বলা কথাগুলো গুমরে কেঁদে উঠে, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে আমি জানি না, কিছু জানি না, কিন্তু কোনো কথা বলা হয়না আমার, গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হয়না আমার, না কোন লাভ নেই, অন্য ভাবে চেষ্টা করতে হবে.. ডাক্তার বললেন, আসুন আমার সাথে, ওরা হেটে করিডোর এ চলে গেল,
—এখন একটাই পথ, ঐ দুইজন রিকশাওয়ালাকে খুঁজে বের করতে হবে, ডাক্তার ওদের চেহারা কেমন মনে আছে আপনার…
-ভালো করে দেখিনি, তখন তো রোগী নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম,তবে কমন চেহারা, চেহারায় কোনো বিশেষত্ব নেই, দেখলে হয়তো চিনতে পারবো, –কোথায় মেয়েটাকে পেয়েছে কিছু বলেছে, —রাস্তার ধারে একটা টিনের ঘর, জায়গাটা ঝিলপাড়,ওরা বললো ভেতরে শুধু চেয়ার, বেঞ্চ, আর একটা টেবিল, ক্লাব ঘর হবে হয়তো, ছেলেরা ওখানে আড্ডা দেয়, ওরা ঐ ঘরের পাশে বসেছিল রিকশা নিয়ে, ভিতর থেকে গোঙানির মতো আওয়াজ আসছিল অনেকক্ষন ধরে, ওরা তখন কৌতূহলী হয়ে দরজার পাশে যায়, দরজাটা বাইরে থেকে শিকল তোলা ছিল, ওরা শিকল খুলে ভিতরে যেয়ে মেয়েটিকে দেখতে পায়, রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের এককোনে পড়ে আছে, দেরি না করে ওরা ওখান থেকে মেয়েটিকে তুলে এখানে দিয়ে গেছে, পুলিশ বললো
—ওরা আর আসেনি…..
–নাহ ওরা আর আসেনি…..
—-আচ্ছা আমি একজন আর্টিষ্ট পাঠিয়ে দিচ্ছি, একটা স্কেচ করবে,আপনার যতটুকু মনে পড়ে
ওনাকে বলবেন,
—জ্বি আচ্ছা, ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল পুলিশ, ডাক্তার আমার রুমে এলেন, আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছি, উনি আমার মাথায় হাত
রাখলেন,বললেন
-মা তুমি কোথা থেকে এসেছ,কথা বলার চেষ্টা কর, যদি না বলো তাহলে আমরা কিভাবে জানব তোমার এই অবস্থার জন্য দায়ী কারা, আমরা তাদের কিভাবে শাস্তি দিব,কথা বলো মা, কথা বলো, বলে উনি আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন,
প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম আমি, এতো ভালো মানুষ হয়..কতোটা সুন্দর করে আমাকে মা ডাকছে, বাবা তো কখনো আমাকে মা বলে ডাকে নি, শুধু অকারণে বকাঝকা করেছে, আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি বলতে.. ডাক্তার ওরা আমাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাকে রক্তাক্ত করেছে, আপনি অস্থির হবেন না, আমি জানি আমি আর বাঁচব না, কিন্তু মরে গেলে ও আমি আপনাকে ভুলবো না, পৃথিবীতে আপনার মতো মানুষ ও হয়….! কিন্তু একটা কথা ও বলতে পারলাম না, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না, শুধু বুকের ভেতর আর্তনাদ করে উঠলো.. হায় খোদা.. আমি কি সত্যি কোন কথা বলতে পারবো না.. আমি আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, আলো ছায়া খেলা করছে গাছের ফাঁকে ফাঁকে, ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়ে আসছে আমার দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে এসেছে… ঘুম… আহা… আমাকে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোথায়.. জানি না কোন
সূদুরে… আমি আবার তোমাকে দেখার চেষ্টা করলাম, ঐ তো আলো আঁধারীর মাঝে তুমি দাঁড়িয়ে আছো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে..সত্যি কি তুমি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছো..একটা সুখানুভূতি বয়ে যায় আমার বুকের ভেতর, আজ বড়ো সাধ হয় বেঁচে থাকার, কিন্তু আমি জানি আমি এখানে থাকবো না, আমি তোমার কাছে যাব,অচেনা অদেখা তোমাকে আমার বড়ো আপন মনে হয়, হ্যাঁ আমি তোমার কাছে যাব,আজ অনেক দিন পর আমার খুব ভালো লাগছে, ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছি আমি ঘুমের রাজ্যে, কে যেন কানে কানে ফিসফিস করে বলছে… ভয় নেই আমি আছি তোমার পাশে… আমি তাকাতে চেষ্টা করলাম, পারলাম না.. শুধু বললাম.. কে তুমি…?
