ভয়াবহ মামলাজটে ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় বছরের পর বছর বিচারাধীন ৪ লাখেরও বেশি মামলা। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। আদালত ভবনের ঘাটতি ও বিচারকসংকটের কারণে বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় দীর্ঘসূত্রতা বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা। এ বিষয়ে রাজশাহী আদালতের সিনিয়র আইনজীবী এজাজুল হক জানান, মামলার তুলনায় বিচারকসংকট আছে। ফলে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটানো যাচ্ছে না। তবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে এখন বেশ কিছু মামলা আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হচ্ছে।

রাজশাহীর আদালত চত্বরে সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের কথা হয় সেরেনা বেগম নামে সত্তরোর্ধ্ব এক নারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, জমিসংক্রান্ত মামলায় ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নাতিকে নিয়ে ঘুরছেন আদালতে। বয়সের ভারে তিনি ন্যুব্জ হয়ে পড়লেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না মামলার। সেরেনা বেগমের দাবি, নগরীর মির্জাপুর এলাকায় তার এক বিঘা জমি দখল করে নিয়েছেন মামাতো ভাইয়েরা। সেই জমি ফিরে পেতে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে মামলা চালাতে গিয়ে এখন নিঃস্ব তিনি। শুধু সেরেনা বেগম-ই নন, এমন অনেকেই আছেন যারা বছরের পর ঘুরছেন বিচারের আশায়। তবে আদালত ভবন ও বিচারকসংকটের কারণে দীর্ঘ হচ্ছে বিচারপ্রক্রিয়া।

রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি প্রায় সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে রাজশাহী জেলার ৩৬টি আদালতে বর্তমানে চেক প্রতারণার ২০ হাজার মামলা, জমিসংক্রান্ত ৩৫ হাজার, পারিবারিক বিরোধসংক্রান্ত মামলা ১২ হাজার, অসংখ্য রাজনৈতিক মামলাসহ সব মিলিয়ে লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন। আর বগুড়ার আদালতে বিচারাধীন অনেক মামলার বাদী-বিবাদী কেউই বেঁচে নেই। এর পরও যুগের পর যুগ মামলা চলছে। জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, স্পেশাল জজ আদালত, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি ও আপিলসহ মোট ৭৫ হাজার মামলা বিচারাধীন। মামলার মধ্যে বেশি জমিজমাসংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকদ্রব্য, বিস্ফোরক দ্রব্য, অর্থ ঋণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা।

নাটোরের দেওয়ানি ও ফৌজদারি ২২টি আদালতে ২০ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। আদালতগুলোতে সাতজন বিচারকের পদ শূন্য থাকায় বাড়ছে মামলাজট। ফলে কোনো কোনো মামলার বিচার পেতে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। বিচারকসংকটের পাশাপাশি চিফ জুডিশিয়াল আদালতের নিজস্ব ভবন না থাকায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনে বিচারকাজ করছেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা। একই অবস্থা সিরাজগঞ্জের আদালতেও।

এদিকে, নওগাঁয় ১৩টি আদালতে দুজন বিচারকের পদ ফাঁকা আছে। এর মধ্যে নারী-শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল আদালতে বিচারাধীন আছে ৪ হাজার ২২০টি। এ ছাড়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮ হাজার ৪৫২ মামলা বিচারাধীন। আর জজকোর্টে ২৬ হাজার ১৭৩ দেওয়ানি ও ফৌজদারি ১২ হাজার ৭৬৮ মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights