ডিসি-এসপিদের ভোট ডাকাতি

বিগত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ভোট ডাকাতিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন অনেক জেলার ডিসি-এসপি। গত নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরও অভিযোগ বিবেচনা করা হয়নি। বরং যেসব ডিসি-এসপির বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতির অভিযোগ ছিল তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রাইজ পোস্টিং বা পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। এই গুরুতর অভিযোগের জন্য বর্তমানে বিভিন্ন সভাসমাবেশে সাবেক সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ কমিশনের অন্য সদস্যদের বিচার দাবি করা হচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচন সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন মতবিনিময় সভায় বিগত কমিশনের বিচার দাবি করা হয়েছে।

বিগত নির্বাচনে বড় ধরনের ভোট ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে। মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজীর পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতি করেছেন তৎকালীন এসপি গোলাম মোস্তফা রাসেল। তাঁর বিরুদ্ধে অন্য প্রার্থীরা তথ্যপ্রমাণসহ ইসির কাছে অভিযোগ করলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল তা আমলে নেননি। বরং এসপিকে মৌখিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। শুধু রূপগঞ্জে নয় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে দেশের অনেক আসনেই। ভোট চলাকালেই অন্তত ৪৬ প্রার্থী নির্বাচনে জালজালিয়াতির অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না শঙ্কায় ভোটের আগেই জাতীয় পার্টির (জাপা) ২১ জনসহ অন্তত ৬০ প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়া-২, সিলেট-৩, রাজশাহী-৬, পাবনা-১, নোয়াখালী-২, ফরিদপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছিলেন। ফরিদপুর-১ আসনে ৫০ কেন্দ্রে ভোটের শেষ ঘণ্টায় ব্যাপক অনিয়ম ও ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ উঠেছিল। এসব আসনে ডিসি-এসপিরা ভোট ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে ওই সময় অভিযোগ করেছিলেন প্রার্থীরা।

এদিকে ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন এসপি গোলাম মোস্তফা রাসেল প্রকাশ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর পক্ষে কাজ করলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ওই এসপির বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের কারণে অনাস্থা প্রকাশ করে স্বতন্ত্র তিনজন প্রার্থী সিইসির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছিল, নারায়ণগঞ্জের এসপির নেতৃত্বে রূপগঞ্জের নির্বাচন পরিচালিত হলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস পাবে না। নির্বাচন কমিশনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুষ্ঠু ভোটের স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁরা ওই এসপির প্রত্যাহার দাবি করেছিলেন। কিন্তু সিইসি সেসব বিষয় আমলেও নেননি। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরও কারচুপির অভিযোগ করেছিলেন ভোটে হেরে যাওয়া অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী। সেই তালিকায় ছিলেন নৌকা, লাঙ্গলের প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতাও। পরাজিত অনেক প্রার্থীর অভিযোগ ছিল ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরানো হয়েছিল। ফলাফল পাল্টে ভোটের হারও অস্বাভাবিক করা হয়েছিল। প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছিলেন তাঁরা।

গাইবান্ধা-১ আসনের দুবারের এমপি জাপার শামীম হায়দার পাটোয়ারী অভিযোগ করেছিলেন, ভোটে কারচুপি হয়েছে। কুমিল্লা-২ আসনে নৌকার পরাজিত প্রার্থী সেলিমা আহমাদ ওই সময় বলেছিলেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ ছিল না। প্রশাসনের নেতৃত্বে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরা হয়েছে। সাতটি কেন্দ্রের ফল বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আবেদন করেছিলেন। সিইসি তা আমলে নেননি।

১৮টি কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন সানজিদা খানম। ২ হাজার ১৯৮ ভোটে পরাজিত সাবেক এই এমপির অভিযোগ ছিল, ওই সব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের আগেই ফলাফল শিটে সই নেওয়া হয়েছিল। ভোটেও কারচুপি হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের অনিয়মে ডিসি-এসপিদের জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ডিসি-এসপিরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন তাঁরা চাপে পড়ে নির্বাচনি অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, অনেক ডিসি-এসপির বিরুদ্ধেই অভিযোগ রয়েছে। অতীতে যাঁরা নির্বাচনি অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন বিশ্লেষক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, বিগত নির্বাচন নিয়ে কথা বলার কারণে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। এসব অনিয়মের জন্য বিগত নির্বাচন কমিশনারদের সতর্ক করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights