অনন্য এক আলোর পথের দিশা

নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয় অনাবিল এক আনন্দ নিয়ে এসেছিল বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের খুদে শিক্ষার্থীদের জীবনে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হলো নতুন বই। কুয়াশাঘেরা শীতের সকালে বই বিতরণের আয়োজন শিশুদের জন্য আলোর পথের দিশা। তারা এমনভাবে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিচ্ছিল, বইগুলো যেন শুধু কাগজের নয়, একেকটি স্বপ্নের সিঁড়ি।

অসচ্ছল পরিবারের অনেক শিশু, যারা এখনো নতুন বইয়ের গন্ধ পায়নি, তারা বই হাতে খুঁজে পেল সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। তাদের সরল চোখের স্বপ্নরা আনন্দে নেচে উঠল। বইয়ের পাতা ওল্টাতেই ওরা যেন খুঁজে পেল নতুন এক পৃথিবী, যেখানে তারা স্বপ্ন দেখতে পারে, এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ।

বই হাতে পেয়ে শিশুদের খিলখিল হাসি আর উচ্ছ্বাসে আকাশ-বাতাস ভরে উঠল। তাদের প্রাণখোলা হাসি প্রমাণ করল, শিক্ষার আলো পৌঁছালে কোনো বাধা অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। সম্প্রতি সারা দেশের ১৯টি জেলায় প্রতিষ্ঠিত ২২টি বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল ক্যাম্পাসের বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ নিয়ে প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য ও ছবিতে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন শাহ্ মো. হাসিবুর রহমান হাসিব

মিরপুর, ঢাকা

ঘন কুয়াশায় মোড়া এক নির্মল সকালে বসুন্ধরা শুভসংঘের আয়োজন উষ্ণতার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বসুন্ধরা শুভসংঘের বন্ধুরা হাজির হন একঝাঁক শিক্ষার্থীর মাঝে, হাতে নতুন পাঠ্যবই।

শিশুদের চোখে বিস্ময় আর মুখে লাজুক হাসি। বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্যরা তাদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেন। বই পেয়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলে, ‘নতুন বছরে নতুন বই পেয়ে আমি অনেক খুশি। বইগুলোর মলাট এত সুন্দর, ভেতরের ছবি আর লেখাগুলো দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে এগুলো পড়ব। আমার বাংলা বইয়ে সুন্দর কবিতা আছে, অঙ্ক বইয়ে মজার অঙ্ক।’

বীরগঞ্জ, দিনাজপুর

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নতুন পাঠ্যবই হাতে পেয়ে শিশুদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল আনন্দের ঝিলিক। সম্প্রতি বীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলে নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে। নতুন বই পেয়ে শিক্ষার্থীরা নেচে-গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। তাদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। শিক্ষার্থীরা জানায়, নতুন বই পেয়ে তারা অত্যন্ত খুশি। এখন থেকেই তারা আগ্রহের সঙ্গে পড়াশোনা শুরু করবে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্যম সৃষ্টি করেছে। নতুন বইয়ের গন্ধ, ঝকঝকে মলাট আর রঙিন ছবি তাদের জ্ঞানের প্রতি আরো আগ্রহ বাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রতিজ্ঞা করেছে, তারা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে এবং ভবিষ্যতে দেশের সেবা করবে।

জলঢাকা, নীলফামারী

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল প্রাঙ্গণে সেদিন উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হবে। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জলঢাকা সরকারি কলেজের প্রভাষক তহিবুর রহমান সেলিন ও আবদুল্লাহ আল মামুন, কালের কণ্ঠের জলঢাকা উপজেলা প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান স্ট্যালিন এবং স্কুলের শিক্ষিকা আয়শা ছিদ্দিকা ও ইতি বানু। নতুন বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। বইয়ের নতুন গন্ধ যেন তাদের চোখে স্বপ্ন আর মনে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। তহিবুর রহমান সেলিন বলেন, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আজকের শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। বসুন্ধরা শুভসংঘের এমন উদ্যোগ শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়, গোটা সমাজের উন্নতিতে অবদান রাখবে। নতুন বই শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনে অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং জীবনের অন্ধকার সরিয়ে তাদের আলোকিত করবে।’

গঙ্গাচড়া, রংপুর

নতুন বছরে নতুন বই হাতে পেল রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর চল্লিশার বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের শিক্ষার্থীরা। নতুন বই হাতে পেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয় তারা। সম্প্রতি বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের শিক্ষক শাহরিয়া সাগর শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের আরেক শিক্ষক জেসমিন বেগম, রংপুর জেলা বসুন্ধরা শুভসংঘের সাধারণ সম্পাদক তানজিম হোসেন, স্কুলের সমন্বয়ক গোলজার রহমান প্রমুখ। নতুন বই হাতে পেয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া বলে, ‘নতুন বই পেয়ে খুব আনন্দ লাগছে। বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুল না থাকলে আমার লেখাপড়া করা হতো না।’

লালপুর, নাটোর

নাটোরের লালপুরে বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হলো নতুন পাঠ্যবই। শিক্ষার্থীদের জন্য দিনটি ছিল এক নতুন অধ্যায়ের উন্মোচন, যেখানে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী হাতে পেল আগামীর পথচলার একটি নতুন দিশারি। স্কুলের প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণবন্ত, উদ্দীপনায় ভরা, যেন সেখানে নবজন্মের উৎসব চলছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমাবেশে মূর্ত হয়ে উঠেছিল শিক্ষার প্রতি এক নতুন অধ্যবসায়, এক নতুন প্রত্যাশা। পাঠ্যবই বিতরণ অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের সমন্বয়ক আক্তারুজ্জামান বাবু ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘এটি শুধু নতুন বই বিতরণ অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রতিশ্রুতি, যা আমাদের শিক্ষার উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। এই বই যেন এক নতুন আকাশের দিগন্ত, যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।’

মাদারীপুর

মাদারীপুরে বসুন্ধরা শুভসংঘের স্কুলে বই উৎসব উদযাপিত হয়েছে। আনন্দঘন পরিবেশে বই উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে শিশু শিক্ষার্থীরা। নতুন বছরে নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মুগ্ধ ও উচ্ছ্বসিত বিদ্যালয়ের শিশুরা। প্রতিটি বইয়ের মলাট ওলটপালট করে দেখতে থাকে তারা। শিশুদের কাছে এ যেন এক নতুন অনুভূতি। তাদের এই আনন্দ দেখে অতিথি ও অভিভাবকরাও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। সম্প্রতি প্রথম ধাপে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে বই বিতরণ করা হয়। শিগগিরই বাকিদের বই বিতরণ করা হবে। বই বিতরণ উৎসবে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফাতিমা আজরিন তন্বী। স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফারজানা নতুন বই পেয়ে অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, ‘আইজ খুব খুশি খুশি লাগতাচে। এত দিন নতুন বই পামু এই আশায় ছিলাম। আইজ মোরা নতুন বছরের শুরুতেই নতুন বই পামু ভাবতি পারি নাই। খুব আনন্দ লাগতাচে।’ প্রথম শ্রেণির আসিফ তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, ‘নতুন বছর আর নতুন বই, মজাটাই আলাদা। খুব আনন্দ লাগতাচে, কী যে আনন্দ তা কইতে পারুম না।’

ফাতিমা আজরিন তন্বী বলেন, ‘এখানে এসে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নতুন বই পাওয়ার আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগছে। এখানে না এলে বুঝতেই পারতাম না এই শিশুদের লেখাপড়ার প্রতি কতটা আগ্রহ। ওদের আনন্দ দেখে সত্যি মনে হচ্ছে, আমি নিজেই যেন শিশুদের সঙ্গে মিশে গেছি। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব কিভাবে স্কুলটিকে আরো সম্প্রসারণ করে উন্নত করা যায়।’

পটুয়াখালী

কুয়াশার বুক চিরে একদল কোমলমতি শিশু নতুন বই হাতে পেতে উদগ্রীব হয়ে ছুটে চলেছে। শিক্ষার্থীদের ছুটে চলতে দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেননি তাদের মায়েরাও। সেদিনের সকালটা যেন মা আর শিশুদের মিলনমেলায় মুখরিত।

সম্প্রতি দশমিনার চরবোরহান ও গলাচিপার চর আগস্তিতে বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের হলরুমে আনন্দঘন পরিবেশে নতুন বছরে নতুন বই তুলে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের হাতে। শিশুদের কলরবে হলরুমে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও কুশল বিনিময় চলে।

‘সবার আগে আমি নতুন বই নিমু। হেইয়ার লইগ্যা আগেই স্কুলে আইছি। আইয়া দেহি সবাই স্কুলে! নতুন বইর ঘ্রাণ ভালো লাগে।’ কথাগুলো বলছিল বসুন্ধরা শুভসংঘ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহাগী। একই শ্রেণির মিরাজ বলে, ‘মায়রে (মা) কইছি বেন্নাকালে (সকালে) ঘুম দিয়া উডাইয়া দেবা। আমি আইজ নতুন বই আনতে যামু।’

অভিভাবক সজিব মোল্লা বলেন, ‘দুই বছর ধরে স্কুলটি চলছে। স্কুল থেকে খাতা, কলম, পেনসিল, রাবার, পেনসিলকাটার দিয়েছে। এমনকি আমাগো বাচ্চাগো লইগ্যা জামা, প্যান্ট, জুতা, ব্যাগও দিছে। আমাগো পোলাপান পড়াইতে আমাগো এক টাহাও খরচা অয় না। সব বসুন্ধরা দেয়। আল্লায় হ্যাগো ভালো করুক।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights