ডায়ালিসিসে মাসে গড়ে খরচ ৪৬ হাজার টাকা

অনলাইন ডেস্ক
ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা আকলিমা। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার ডায়ালিসিস দরকার হয়। টাকার অভাবে একটির বেশি তিনি করাতে পারেন না। শরীরের পরিস্থিতি যখন বেগতিক হয়ে পড়ে তখন আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে ডায়ালিসিস করাতে হয়। আকলিমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায়, বর্তমানে তিনি রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ভর্তি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থেকে শুধু তার দুইটি কিডনিই নষ্ট হয়নি, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে পচনও ধরেছে।

আকলিমার ছেলে মারুফ বলেন, মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে গ্রামে জমি বিক্রি করতে হয়েছে তাদের। মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করায় এখন পরিস্থিতি অনেক খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘আউট অব পকেট কস্ট অব কিডনি ডায়ালিসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়ালিসিসের পেছনে একজন কিডনি রোগীকে মাসে সর্বনিম্ন ছয় হাজার ৬৯০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দুই লাখ ১০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। গড় ব্যয় ৪৬ হাজার ৪২৬ টাকা।

বিআইডিএসের গবেষণা ফেলো আবদুর রাজ্জাক সরকার জানান, গবেষণাটিতে সরকারি, বেসরকারি ও বেসরকারি সংস্থাভিত্তিক (এনজিও) হাসপাতালের ৪৭৭ রোগীর ওপর জরিপ করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। জরিপে দেখা গেছে, একজন রোগীর ৩৫ শতাংশের মতো খরচ হয় ডায়ালিসিস ফি বাবদ। প্রায় ২৩ শতাংশ ব্যয় হয় ওষুধ বাবদ। সব মিলিয়ে হাসপাতালে খরচ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ। অনানুষ্ঠানিক খরচ যেমন- যাতায়াত, খাবার, থাকা ইত্যাদির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯ শতাংশ ব্যয় হয় যাতায়াতে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একজন কিডনি রোগীর প্রতি মাসে আটটি ডায়ালিসিসের দরকার হয়। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ২০১৭ সাল থেকে ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) নিচতলায় বেসরকারিভাবে ডায়ালিসিসসহ কিডনি রোগীদের বিভিন্ন সেবা দিচ্ছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্যানডর ডায়ালিসিস সার্ভিসেস’। রোগীপ্রতি ডায়ালিসিসের জন্য সরকারিভাবে প্রতি সেশনে ৫৩৫ টাকা এবং বেসরকারিভাবে দুই হাজার ৯৩৫ টাকা করা হয়েছে।

ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে নিয়মিত ডায়ালিসিস নেন সাভারের আনোয়ার হোসেন (৪৫)। তিনি জানান, চিকিৎসার খরচ দিতে গিয়ে দুই ছেলের পড়াশোনা বন্ধ। জমিজমা, ভিটেমাটি সব বিক্রি করে দিয়েছি। এখন প্রতি মাসে ঘুরতে হয় ডায়ালিসিসের অর্থের জন্য।

বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়, প্রায় ৯২.৮৭ শতাংশ পরিবারই ডায়ালিসিস করাতে গিয়ে আর্থিক সমস্যায় পড়ে। সাড়ে ১৯ শতাংশ রোগী প্রয়োজনের চেয়ে কম ডায়ালিসিস করায়। হারটি গরিবদের মধ্যে বেশি। রোগীদের মধ্যে যারা কম ডায়ালিসিস করায়, তারা কারণ হিসেবে (৯৫ শতাংশ) অনেক বেশি ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কিডনি বিকল ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ, যারা ডায়ালিসিস নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের একটি বড় অংশ অর্থের অভাবে সময়মতো ডায়ালিসিস করাতে পারে না। মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করায় হচ্ছে নিদারুণ কষ্ট এবং অকালমৃত্যু।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুন-উর-রশিদ বলেন, ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর উপসর্গ দেখা দেয়। কিডনি যদি অকেজো হয়ে যায় তাহলে তা প্রতিস্থাপন ও ডায়ালিসিস ছাড়া বাঁচার উপায় থাকে না। কিন্তু এই দুটি চিকিৎসাপদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

ডায়ালিসিস ও চিকিৎসকের সংকট :

কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডায়ালিসিস সেন্টারের সংখ্যা ১৬১। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই বেসরকারি। এসব সেন্টারের ৭০ শতাংশই ঢাকায়। বাংলাদেশে দুই কোটি রোগীর বিপরীতে নেফ্রোলজিস্ট মাত্র ২০০ জন, যা বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খুবই অপ্রতুল।

বিআইডিএসের জরিপে দেখা যায়, ডায়ালিসিস সেবা নিতে রোগীদের ৪২.৫৬ শতাংশ যায় এনজিওভিত্তিক হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালে যায় প্রায় ৩৩.৫৪ শতাংশ। বেসরকারি হাসপাতালে যায় ২৩.৯ শতাংশ রোগী। ব্যয় বেশি বেসরকারি হাসপাতালে, মাসে গড়ে খরচ ৭৭ হাজার ৫৮৯ টাকা। সরকারিতে তা ৩২ হাজার ৫৫২ টাকা এবং এনজিওভিত্তিক হাসপাতালে ৩৯ হাজার ৯১২ টাকা।

কিডনি প্রতিস্থাপন বাড়াতে হবে :

ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজির সার্জন অধ্যাপক ডা. মো. শওকত আলম জানান, বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হলেও দ্বিতীয় প্রতিস্থাপনটি হয় ১৯৮৮ সালে। এ পর্যন্ত তিন হাজারের কিছু বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

ডা. শওকত বলেন, ‘দেশে প্রতিবছর পাঁচ হাজার মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৬৫ জনের, যা প্রয়োজনের মাত্র ৭.৩ শতাংশ। তা ছাড়া আমাদের দেশে কিডনিদাতার যেমন প্রকট সংকট, তেমনি আইনি জটিলতাও রয়েছে।’

তথ্য সূত্র – কালের কণ্ঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights