টিকফার মাধ্যমে অবস্থান তুলে ধরে শুল্ক কমানোর আলোচনা করতে হবে ড. মোস্তাফিজুর রহমান

ড. মোস্তাফিজুর রহমান
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ৩৭ শতাংশ শুল্ক আমাদের জন্য অতিরিক্ত। চলমান যে শুল্ক রয়েছে, তার সঙ্গে এটা যোগ হবে। আগে থেকেই একেক পণ্যে একেক পরিমাণ শুল্ক বসানো ছিল। গড়ে যা ১৫ শতাংশ।

এর ফলে আমাদের ওপর মোট ৫২ শতাংশ শুল্কের বোঝা চাপবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। চীনের ওপর ৫৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ওপর ৪৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এসব শুল্কের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের মূল্য দিতে হবে।

আমাদের মোট রপ্তানির ৯০ শতাংশ রয়েছে তৈরি পোশাকের দখলে। শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাবে। এতে আমাদের রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রতিযোগী দেশগুলোর পণ্যের ওপরও কমবেশি শুল্ক বসানো হয়েছে।

এ কারণে প্রতিযোগিতার ধরনেও পরিবর্তন আসবে। চীন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের তুলনায় আমরা হয়তো কিছুটা সুবিধা পাব। আবার ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ২৭ শতাংশ। পাকিস্তানের পণ্যের ওপর শুল্ক বসানো হয়েছে ২৯ শতাংশ। ফলে তারা আমাদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। এটাই শেষ, তা নয়। আরো বেশি পরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য বাংলাদেশ আমদানি করে, তার ওপর বসানো শুল্কের পরিমাণ ৭৪ শতাংশ। বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে এই শুল্ক বসানো হয়েছে। আমাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে। এটা তারা হিসাব করেছে। আমাদের আমদানি শুল্ক ও মুদ্রা বিনিময়ের হার তারা হিসাব করেছে। কিন্তু তাদের হিসাবটা স্বচ্ছ নয়। আমাদের পোশাক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি করতে হয়। তুলার ওপর আমদানি শুল্কের পরিমাণ শূন্য। এই তুলা ব্যবহার করে তাদের দেশে পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তাদের দেশের কাঁচামাল আমদানি করে প্রস্তুতকৃত পণ্য সেই দেশেই রপ্তানি করা হলে শুল্কনীতি কিছুটা শিথিল হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম তারা অনুসরণ করেনি।

তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য যে তুলা ব্যবহৃত হয়, তা যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আমদানি করা হয়। ২০২৩ সালে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করা শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি বাংলাদেশ। এই বিষয়গুলো তুলে ধরে ইউএস রিপ্রেজেন্টেটিভের অফিসে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করার সুযোগ আছে।

টিফকার প্ল্যাটফর্মেও এ বিষয়ে আলোচনা চালানো যায়। যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হলো, তা মোকাবেলায় একেক দেশ একেক পদক্ষেপ নেবে। ইউরোপ, চীন পাল্টা শুল্ক বসাবে। আবার আমাদের মতো দেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করতে পারে। বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব রপ্তানির ওপরও পড়বে। বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীন ও ইউরোপের প্রবৃদ্ধি কমবে। আমাদের পণ্য আমদানিকারক অন্য দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমবে, একই সঙ্গে চাহিদাও কমে যাবে। ফলে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের চাহিদা কমবে তা নয়, বৈশ্বিকভাবেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আমাদের চলমান সংস্কার কর্মসূচি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ব্যবসার খরচ কমানো, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা জোরালোভাবে চালিয়ে নিতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প নেই।

বাজার বৈচিত্র্যকরণ, বিকেন্দ্রীকরণ, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আঞ্চলিক বাজারের সুবিধা গ্রহণ—এসবের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, তা এবার প্রমাণ হয়ে গেল।

লেখক : সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights