ব্যবসায়ীর ফেলে যাওয়া ১৮ ভরি স্বর্ণ ‍ফিরিয়ে দিলেন অটোরিকশাচালক

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া

বগুড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সততায় স্বর্ণ ব্যবসায়ীর ফেলা যাওয়া ২৫ লাখ টাকা মূল্যের ১৮ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ১৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

শুক্রবার রাত ১১টায় বগুড়া সদর থানায় পুলিশের মাধ্যমে স্বর্ণের প্রকৃত মালিককে এসব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৮ ভরি স্বর্ণ ফিরিয়ে দিয়ে শততার আরেক দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন খায়রুল ইসলাম নামের ওই অটোরিকশাচালক।

জানা গেছে, বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ি হাজীপাড়ার খায়রুল ইসলাম তার লেখাপড়ার খরচ জোগাতে ও বাড়তি আয় করতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান। খায়রুল বগুড়ার একটি সরকারি কলেজে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রতিদিনের মতো ঈদের দুই দিন আগে ২৯ মার্চ অটোরিকশা চালাচ্ছিলেন তিনি। সেই দিন ইফতারের আগে জুয়েলারি ব্যবসায়ী পাবনার ফরিদপুর উপজেলার উত্তর গোপালনগর এলাকার শফিউর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ শাহিন বগুড়া নিউ মার্কেট থেকে ২৫ লাখ টাকা মূল্যের প্রায় ১৮ ভরি স্বর্ণ কিনে একটি কালো রঙের ব্যাগে ভরে বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরার পথে খায়রুলের অটোরিকশা করে শাজাহানপুর উপজেলার বনানীতে গিয়ে দ্রুত বাসে উঠে যান। বাসে উঠে ইফতার করার সময় তার মনে পড়ে যায় স্বর্ণসহ নগদ ১৫ হাজার টাকার ব্যাগটি অটোরিকশা ফেলে এসেছেন। বাস থেকে নেমে অটোরিকশাচালককে খুঁজে না পেয়ে শাজাহানপুর থানা ও বগুড়া সদর থানায় গিয়ে আইনগত সহযোগিতা কামনা করেন।

পুলিশের পরামর্শে তিনি শাজাহানপুর থানায় একটি জিডি করেন এবং বাড়ি ফিরে যান। এরপর থেকে স্বর্ণ ব্যবসায়ী শাহিন বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় তার হারিয়ে ফেলা ব্যাগটির খোঁজ করতে থাকেন। একপর্যায় সেটি না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

এদিকে, নিজের অটোরিকশায় ব্যাগটি পেয়ে সেটি না খুলে ওই যাত্রীর সন্ধান করতে থাকেন খায়রুল। সেদিন ব্যাগটির মালিককে খুঁজে না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। বাড়ি গিয়ে খায়রুল তার মাকে সব খুলে বলেন। তার মা তাকে বলেন স্বর্ণগুলো প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরে দিতে। পরে পরিচিত এক পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে বগুড়া সদর থানায় যোগাযোগ করেন খায়রুল।

সর্বশেষ শুক্রবার রাতে বগুড়া সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এসএম মঈনুদ্দীনকে বিষয়টি জানালে তিনি দ্রুত স্বর্ণের মালিককে ডেকে নেন। সেদিন রাত ১১টায় প্রকৃত মালিক শাহিনের হাতে ১৮ ভরি স্বর্ণ ও ১৫ হাজার টাকার ব্যাগটি তুলে দেন।

বগুড়া সদর থানায় ওসির কক্ষে অটোরিকশাচালক খাইরুলকে দেখেই চিনতে পারেন যাত্রী শাহিন। মালামাল ফিরে পেয়ে যাত্রী শাহিন ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার হিসেবে দিতে চান অটোরিকশাচালক খাইরুলকে। অটোরিকশাচালক খাইরুল পুরস্কারের টাকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং বলেন ব্যাগে থাকা সোনা ও টাকা তাকে ফিরিয়ে দিতে পেরে তিনি দায়মুক্ত হয়েছেন।

আবেগাপ্লুত শাহিন স্বর্ণ ফিরে পেয়ে জানান, তিনি ভেবেছিলেন তার সব শেষ হয়ে গেছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পর থানার ওসির ফোন পেয়ে আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়েন। অটোরিকশাচালক খায়রুলের সততা তাকে মহিত করেছে। খায়রুলের মতো মানুষ থাকলে সমাজের কোনো ভয় নেই।

সিএনজি চালক খায়রুল জানান, সারা জীবন সৎ থাকতে হবে, সৎ থাকলে পরকালে ভালো হবে। মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি সোনার গহনা ও টাকাগুলো ফেরত দিতে পেরে ধন্য মনে করছেন। শিক্ষার উদ্দেশ্য মনুষ্যত্ব অর্জন, অসততা নয়।

বগুড়া সদর থানার ওসি এসএম মঈনুদ্দীন জানান, খায়রুল মূলত একজন শিক্ষার্থী। অটোরিকশা চালিয়ে নিজের লেখাপড়ার জন্য খরচ বহন করেন। তিনি শুধু সৎ নন, দায়িত্বশীল ও মানবিকও। তার মতো মানুষই আমাদের সমাজে আরও আলো ছড়াবে। এ যুগেও যে হাজারো মানুষের ভিড়ে সৎ মানুষ আছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ খায়রুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights