ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ (সা.) মুসলিম উম্মাহর সম্পর্ককে এক দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যদি মুসলিমরা এক দেহের মতো হয় কিংবা এক গাঁথুনির মতো, যেখানে এক অংশ অন্য অংশকে শক্তি জোগায়, তাহলে তাদের মাঝে বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা বা সম্পর্কচ্ছেদ থাকার কথা নয়; বরং তাদের মধ্যে হওয়া উচিত সম্পর্ক রক্ষা, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও মিলমিশ আর পারস্পরিক ঐক্য আরো দৃঢ় হওয়া উচিত।

ইসলামের শত্রুদের হৃদয় যেসব কারণে প্রশান্ত হয় এবং চোখ শীতল হয়, তার অন্যতম হলো, মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, পরস্পরের প্রতি বিরূপতা, পরস্পর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং একে অপরের সঙ্গে বিবাদে লিপ্ত হওয়া। এই বিভেদই তাদের বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত করে ফেলে, যার ফলে তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়, শক্তি দুর্বল হয় এবং শত্রুরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এ কারণেই ইসলাম অত্যন্ত কঠোরভাবে মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেছে এবং সুস্পষ্টভাবে পারস্পরিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও।’
(সুরা : আনফাল, আয়াত : ১)

আল্লাহর নির্দেশনা সরাসরি বিবাদে লিপ্ত মুসলিমদের প্রতি যে তোমরা আল্লাহকে ভয় করে তোমাদের জেদ, শত্রুতা, বিদ্বেষ থেকে বেরিয়ে এসে পরস্পরের সম্পর্ক ঠিক করে নাও। এটা আল্লাহর আদেশ।

আর বিবাদে লিপ্ত মুসলমানদের আশপাশের মুসলমানদের দায়িত্ব হলো, তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘আর যদি মুমিনদের দুটি দল পরস্পর লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৯)

অন্য আয়াতে তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.) তার উম্মতদের ভ্রাতৃত্ব রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মুসলমানের জন্য তার অপর মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের অধিক সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকা উচিত নয়। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, হিংসা কোরো না, একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ কোরো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় উপেক্ষা করা হালাল নয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৫)

নবীজি (সা.) মুসলমানদের সম্পর্ক রক্ষাকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে প্রয়োজনে দুজন মুসলিমের মধ্যে মীমাংসা করতে কিছু বাড়িয়ে বলারও অনুমতি দিয়েছেন। হুমাইদ ইবনে আব্দুর রহমান (রহ.) থেকে তাঁর মায়ের সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সে মিথ্যাবাদী নয়, যে দুজনের মধ্যে মীমাংসার জন্য কিছু কথা বাড়িয়ে বলে।

আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুসাদ্দাদ (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি লোকদের মধ্যে মীমাংসার জন্য কিছু উত্তম কথা বলে এবং কিছু বাড়িয়ে বলে, সে মিথ্যুক নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯২০)

শয়তান সব মুসলমানকে নামাজ থেকে বিরত রেখে তার অনুসরণ করাতে পারে না, তাই মুমিনদের বিভ্রান্ত করতে তার শেষ অস্ত্র হলো, তাদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করে দেওয়া, তাদের বিভক্ত করে দেওয়া।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী (সা.)-কে বলতে শুনেছি, শয়তান হতাশ হয়ে গেছে যে নামাজি লোকেরা তাকে উপাসনা করবে না। তবে সে তাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা লাগিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়নি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৩৭)

ইমাম নববী বলেন, ‘হাদিসের অর্থ হলো শয়তান জানে, নামাজি মুসলিমরা তাকে উপাসনা করবে না, তাই সে মুসলিমদের মধ্যে ঝগড়া, হিংসা, যুদ্ধ এবং বিশৃঙ্খলা লাগাতে সচেষ্ট থাকে।’

শয়তানের এই পদক্ষেপকে হালকাভাবে চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। এটা তার খুব সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী একটি চাল। কারণ মুমিনরা যখন একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তখন তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, কিছু বিশেষ সময় মহান আল্লাহ অগণিত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ পোষণকারী মুসলিম নামাজিরা সেই সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবারে জান্নাতের দরজাগুলো খোলা হয়। তখন আল্লাহ প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করে না। তবে সেই ব্যক্তি ব্যতিক্রম, যার সঙ্গে তার ভাইয়ের শত্রুতা থাকে। তখন বলা হয়, এ দুজনকে সময় দাও, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৩৮)

এখানে পরস্পর সম্পর্কচ্ছেদকে শিরকের পর্যায়ে না বললেও একজন শিরককারীকে যেভাবে ক্ষমার আওতামুক্ত রাখা হয়, তেমনি পরস্পর বিদ্বেষপোষণকারীকেও ক্ষমার আওতামুক্ত রাখা হয়, যা সত্যিই ভেবে দেখার বিষয়। অন্য হাদিসে তো এক বছর পরস্পর সম্পর্কচ্ছেদকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আবু খিরাশ আস-সুলামী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘যে তার ভাইয়ের সঙ্গে এক বছর সম্পর্ক ছিন্ন রাখল সে যেন তাকে হত্যা করল।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৫)

অতএব, আমাদের সবার উচিত মহান আল্লাহকে ভয় করা এবং নিজেদের সব রাগ-ক্ষোভ থেকে বের হয়ে এসে পরস্পর সন্ধি করে নেওয়া। একটা মানুষ বাঁচেই কত দিন। সামান্য বিষয় নিয়ে পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করে আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো মানে হয় না। এ অবস্থায় যদি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হয়, তবে সে ক্ষতি পোষানোর কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। মহান আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights