এই ফড়িং টা

ফড়িং টার বয়স আজ ১০ বছর। আব্বু আম্মুর কঠোরতার কারনে স্কুল আর কলেজ বয়সে প্রেম করার সুযোগ হয়নি। ২০১৫ সালে ইন্টার দিয়ে যখন ঢাকায় আসি, তখন একটা প্রেম হয়। প্রথম প্রেম। স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম প্রেমে আমার আবেগ ও ভালোবাসা অনেক বেশী কাজ করেছিলো। আমাদের রোজ দেখা হতো, আমরা প্রায় সন্ধ্যায় ড্রাইভে যেতাম মাওয়া। কারন ইলিশ ওর খুব প্রিয় ছিলো, আর আমার প্রিয় ছিলো সে।

কোনো এক বিকেলে উত্তরা দিয়াবাড়ি গিয়েছিলাম তখন এই ফড়িং টা আমাদের গাড়ির ভিতর ঢুকে যায়। আমি গ্লাস নামিয়ে ফড়িং টাকে বের করার অনেক চেষ্টা করি কিন্তু ফড়িং টা কিছুতেই বের হচ্ছিলো না। বারবার এদিকে ওদিকে বাড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েছিলো। তারপর তুলে দেখি ফড়িং টা মারা গেছে। আমি আস্তে করে সেটাকে আমার ব্যাগে থাকা একটা ব্রেসলেটের বক্সে ঢুকিয়ে রাখি।

সে যখনই আসতো আমার জন্য ফুল আনতো। সে জানে আমার প্রিয় ফুল লিলি। কোনো এক বৃহস্পতিবার ফুলের দোকানে লিলি ছিলোনা। সে ১ ঘন্টা জ্যাম ঠেলে ধানমন্ডি থেকে মোহাম্মদপুর তাজমহল রোড গিয়ে লিলি নিয়ে তারপর আমার কাছে এসেছিলো। তারপরেও কখনো খালি হাতে আসতো না।

আমি ছিলাম তখন প্রচন্ড কনজার্ভেটিভ। গ্রাম থেকে আসা একদম সহজ সরল মিডিল ক্লাস ফ্যামিলির এভারেজ একটা মেয়ে। সালোয়ার কামিজ ছাড়া আর কোনো পোষাক কখনো পরা হয়নি।

সে আমার সরলতা খুব পছন্দ করতো। সব সময় বলতো “জয়া তুমি একটা বোকা, তুমি কবে যে চালাক হবা” বলতো আর হাসতো।

দেখা হলেই আমরা দুজন ঘুরতাম। কারনে অকারণে ঘুরাঘুরি করতাম। খুদা পেলে রেস্টুরেন্টে খেয়ে সাথে সাথে বের হয়ে যেতাম। রেস্টুরেন্টে বসে থাকার চেয়ে বাইরে ঘুরাঘুরি টাই আমরা বেশী পছন্দ করতাম। রাইফেল স্কয়ারের নিচে ফুড কোর্টে আড্ডা দিতাম, টিএসসি যেতাম চা খেতে, ফুলার রোডে গাড়ি রেখে হাটতাম দুইজনে হাত ধরে, মধ্যরাতে চানখার পুল যেতাম উঠের খিচুড়ি খেতে, রাত ৩ টায় নাজিরা বাজার যেতাম, লালবাগ যেতাম, ধানমন্ডি লেকে বসে ও গিটার বাজাতো আমি ওর কাধে মাথা রেখে শুনতাম। এখন উবদি আমার জীবনের সব চেয়ে সেরা সময় ছিলো তার সাথে কাটানো এই মুহুর্ত গুলো।

আমার বয়স তখন ১৮, সে ২৬। আমরা বিয়ে নিয়ে অনেক প্ল্যান করেছিলাম। সব কিছু খুব সুন্দর ভাবেই যাচ্ছিলো। আমরা সোবহানবাগ মসজিদ থেকে ধানমন্ডি ৩২ দিয়ে ঢুকে বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। সে আমাদের বিয়ে নিয়ে তার আম্মুর সাথে কথা বলেছিলো। আম্মু আমাকে দেখতে চেয়েছেন এতটুকু বলেছে ওমনি তার ফোনটা বেজে উঠে। তার বাবার কল, যেহেতু সে ড্রাইভ করতেসে তাই আমাকে বললো ফোনটা পিক করে স্পিকার অন করতে। কলটা পিক করার সাথে সাথে বাবা বলে উঠলো “ইমার্জেন্সি একটা কাজে চট্টগ্রাম যেতে হবে এখনই,তুমি কোথায় দ্রুত বাসায় আসো”

তখন অলরেডি রাত ১১ টা বাজে। লাস্ট ফ্ল্যাইট তো মিস হয়ে গেছে, গাড়িতেই যেতে হবে।

ও আমাকে বাসার নিচে নামিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় একটা হাগ করতো সব সময়। সেদিন যখন সে জড়িয়ে ধরেছিলো, আমি ছাড়তে চাচ্ছিলাম না। কেন যেন আমার বুকের ভেতরটা বড্ড ছটফট করছিলো। আমাদের রিলেশনে ৪ মাসের ভিতর কখনো এরকম অনুভব হয়নি। আমার মনে হচ্ছিলো কেউ যেন ওকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। খুব খারাপ লাগছিলো সেদিন। ওকে একবার মানা করলাম যে প্লিজ আজকে যেও না, আমার মনটা কেমন যেন করছে।

বরাবরের মতো আজকেও সে ওই একই কথাটা বললো “ধুর বোকা মেয়ে, আমার পাগলীটা কবে যে চালাক হবে” বলে চলে গেলো।

বাসায় গিয়ে ডিনার করে রেডি হয়ে রাত ১ টায় রওনা দিলো চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। ভোর ৪ টায় তার গাড়ি এক্সিডেন্ট করে একটা ট্রাকের সাথে। আমি তখন গভীর ঘুমে। ৪:৪০ মিনিটে আমার কাছে একটা কল আসে তার ফোন থেকে। আমি ওর নাম্বার দেখে ফোনটা ধরেই বলে উঠি

-জান পৌছাইসো?

ওপাশ থেকে আগুন্তক

-আমি এসআই কবির। লাস্ট কলে আপনার নাম্বারটা ছিলো, উনি আপনার কে হন?

আমি ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠি। উনি হ্যালো হ্যালো করতেসে তারপর বললাম

-আমার বয়ফ্রেন্ড

-উনি রোড এক্সিডেন্ট করেছেন। হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।

আমি চিল্লায় উঠে বলতে থাকি

-স্যার ও ভালো আছে তো, ও ঠিক আছে স্যার?

উত্তর আসে

-উনি মারা গেছেন।

তারপর আমাদের আর কখনো দেখা হয়নি। প্রিয় মানুষটাকে শেষবারের মতো দেখার ভাগ্যও আমার হয়নি। তার লাশ চট্টগ্রামে তাদের বাড়িতেই কবর দেওয়া হয়। আমাদের সম্পর্কের ৪ মাসে তার দেওয়া প্রতিটা ফুল আজও যত্নে আমার কাছে রাখা আছে। তার দেওয়া চুলের ক্লিপ, ব্রেসলেট, আংটি, সালোয়ার কামিজ যেটা আমার গায়ে আর হয়না সেটাও অতি যত্নে রয়েছে আমার কাছে।

সে তো আর নেই। চাইলেও তাকে ধরা যায়না, ছোয়া যায়না। তাই তার দেওয়া জিনিসগুলো কেই মাঝেমধ্যে আকড়ে ধরে কাদি। এ ছাড়া আর কোনো চিহ্ন তো আমার কাছে নেই। পোস্টটা লিখার সময়ও বুকটা ফেটে কান্না আসতেসে। চিতকার করে কাদতে ইচ্ছা করতেসে।

ও চলে যাওয়ার পর আমি নিজেকে এতোটাই চেঞ্জ করে ফেলেছি যেন আমার কখনো কান্না না পায়।নিজেকে এতোটা শক্ত বানিয়েছি যেন আমার মনে না পড়ে ওর কথা। লাভ কি হলো ১০ বছর পেরিয়ে গেলো আজ আবার কাদছি। খুব কাদছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights