মরুর দুম্বা বাংলাদেশে পালন

সাইফুল মিলন, গাইবান্ধা
মরুভূমির প্রাণী দুম্বার ভিন্নধর্মী খামার এখন গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে। সাদুল্যাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের দড়ি জামালপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা জাহিরুল ইসলাম জাহিদ। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরির পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন পূরণে গড়ে তুলেছেন দুম্বার খামার। জানা যায়, জাহিরুল ইসলাম দিনাজপুর সদর উপজেলায় একটি এনজিওতে চাকরি করছেন। সেখানকার বোচাগঞ্জের হান্নান মিয়া নামের এক উদ্যোক্তার দুম্বার খামার ঘুরে আসেন। তখন থেকেই নিজেও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। প্রাথমিক অভিজ্ঞতায় গত আট মাস আগে এজেন্টের মাধ্যমে সাড়ে ৮ লাখ টাকা দিয়ে ভারত থেকে তুর্কি জাতের একটি পাঠাসহ পাঁচটি দুম্বা কিনেন। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী মাচা পদ্ধতি এসব পশু পালন শুরু করেন। এরই মধ্যে পেয়েছেন একটি বাচ্চা। আরও তিনটি দুম্বা গর্ভধারণ করেছে। আর কিছুদিন পরই সেগুলো প্রসব করবে। এ অবস্থায় ধীরে ধীরে খামার সম্প্রসারণ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ থেকে নিজে স্বাবলম্বী হওয়াসহ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। এখন তার খামারে থাকা একেকটি দুম্বার ওজন ৭৫ থেকে ১২০ কেজি পর্যন্ত। এই দুম্বার প্রতিটির বাজারমূল্য আড়াই লাখ থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ছয় মাস বয়সি একটি বাচ্চা দুম্বার দাম পড়ে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। খামারে প্রতিদিন রুটিন মাফিক দুম্বাকে খাওয়ানো হয় ঘাস, খড়, পাতা, ভূষি ও সরিষার খৈল। শান্ত স্বভাবের প্রাণী হওয়ায় দুম্বা পালন বেশ সহজ বলে জানান জাহিদ ও তার ভাই জিন্নাহ। তারা বলেন, দুম্বার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি হওয়ায় চিকিৎসা খরচও খুব কম। স্থানীয়রা বলছেন, দুম্বা মরু অঞ্চলের প্রাণী হলেও বেশ কয়েক বছর আগে থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে দুম্বা পালন শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক মাস আগে পাঁচটি দুম্বা দিয়ে খামার শুরু করেছেন জাহিদ মণ্ডল। এখানে প্রতিদিন উৎসুক জনতা আসেন। এই প্রথম নিজ চোখে দুম্বা দেখতে পেয়ে অনেকটা আনন্দিত ও পালনে আগ্রহ জাগছে তাদের। একই এলাকার কলেজপড়ুয়া যুবক কাওছার মাহমুদ বলেন, ‘জাহিদ ভাইয়ের খামারে প্রথম দুম্বা দেখেছি। আমাদের এলাকায় দুম্বা পালন হওয়ায় আশপাশের অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। অনেকে আবার জাহিদ ভাইয়ের কাছে পরামর্শও নিচ্ছেন।’ দুম্বার খামারের জন্য পরামর্শ নিতে গাইবান্ধা পৌর শহরের থানাপাড়া থেকে আসা মিজানুর রহমান সিদ্দিক বলেন, ‘দুম্বার খামার দেখতে এসেছি। সেই সঙ্গে নতুন খামারের জন্য পরামর্শ নিতে এসেছি। যদি সম্ভব হয় আমিও দুম্বার খামার করব।’ বর্তমানে জাহিদ মণ্ডলের ব্যবস্থাপনায় খামার দেখাশোনা করছেন, তার মা পারভীন বেগম ও ছোটভাই জিন্না মণ্ডল। তারা নিয়ম অনুযায়ী দুম্বাগুলোকে খাদ্য ও গোসল দেওয়াসহ সার্বিকভাবে লালন-পালন করছেন। মা পারভীন বেগম বলেন, মাসে দুইবার দুম্বাগুলোকে গোসল করানো হয়। শেড ঘরের বাইরে আবদ্ধ প্রাচীরে আঙিনায় দলবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়ায় এই প্রাণীগুলো। তা সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে হয়।’ জিন্না মণ্ডল বলেন, ‘দুম্বাকে পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করতে খাবারের ব্যবস্থাপনা জরুরি। এ প্রাণীকে দিতে হয় দানাদার খাবার যেমন- খড়, ভুসি, ঘাস প্রভৃতি। পরিমাণভাবে দিনে তিন বার খাবার দিতে হয়। তবে গরু-ছাগলের চেয়ে সহজে দুম্বা পালন করা যায়।’ জাহিরুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘শখ ছিল যে আমি ব্যতিক্রম কিছু একটা করব। আমি যদি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে পারি তাহলে কোরবানির সময় এর চাহিদা বাড়বে। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে আমার এই খামারটি সম্প্রসারণ করে যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।’ প্রান্তিক পর্যায়ে দুম্বা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে দেশে দুম্বার চাহিদা ও বাজার আরও সমৃদ্ধ হবে। যথাযথ পরিকল্পনা ও পরিচর্যা থাকলে দুম্বা খামার গড়ে তোলা এক লাভজনক উদ্যোগ হতে পারে। এ ব্যাপারে সাদুল্যাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দুম্বা পালন বেশ লাভজনক। জাহিদ দুম্বার খামার করেছে, এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। সে সফল হলে তার দেখাদেখি অনেক উদ্যোক্তা এখানে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights