চালবাজির অভিযোগে সরকারি খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা আলোচনায়
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: ২১.০৯.২০২৫
কুড়িগ্রামের রৌমারী সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। চাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে গুদামজাত ও বিতরণ প্রায় প্রতিটি ধাপেই অনিয়মের প্রমাণ মিলছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। শুধু তাই নয়, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব নম্বরে কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে রৌমারী খাদ্য গুদামে যোগদানের পর থেকেই নানা ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন শহীদুল্লাহ। ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেট গঠন, আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ, সরকারি চাল বিতরণে ঘুষ বাণিজ্য সবকিছুর সঙ্গেই তার নাম উঠে আসছে। এমনকি তার আগের কর্মস্থল ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার যাদুরানী খাদ্য গুদামেও প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। একাধিক সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশ পেলেও তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি রৌমারীতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে নিম্নমানের চাল সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে মানহীন চাল ধরা পড়ে। এমনকি গত ১৮ সেপ্টেম্বর স্থানীয় জনতা সরকারি গুদাম থেকে দুই ট্রাক নিম্নমানের চাল আটক করে। এতে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার অনিয়ম আরও প্রকাশ্যে আসে।
এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় চালকল মালিক নাসির উদ্দিন লাল আদালতে মামলা করেন শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ করেন, শামীম এন্টারপ্রাইজ নামে কোনও চাতাল সরকারি তালিকায় না থাকলেও ওই নাম ব্যবহার করে তার সরবরাহকৃত ১০ টন চালের টাকা আত্মসাৎ করেন শহীদুল্লাহ। শুধু তাই নয়, গত আমন মৌসুমেও প্রায় তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলেও প্রতিকার না পেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন এই ব্যবসায়ী।
অনুসন্ধানে শহীদুল্লাহর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সোনালী ব্যাংক রৌমারী শাখার এক হিসাবে ২০২৫ সালের ২৫ মে থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত জমা ও উত্তোলন হয়েছে প্রায় ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে একবারে ৩৩ লাখ টাকার চেক উত্তোলনের ঘটনাও রয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহ সোনালী ব্যাংক শাখার আরেকটি হিসাবে ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকার লেনদেন হয়। এমনকি রৌমারী ও কুড়িগ্রাম শহর থেকেও টাকা জমা হয়েছে ওই হিসাবে।
একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত হিসাবে এমন অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, এসব টাকার উৎস কী, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকে এ তথ্য পাঠানো হয়েছে কিনা তাও তদন্ত দাবি করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন। আমি এসব করিনি। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।” ব্যক্তিগত হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “আমার চাচাতো ভাই গরু ব্যবসা করেন। তার টাকার লেনদেন হয়েছে আমার হিসাবে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে এটা ভুল হয়েছে, তবে এর বাইরে কিছু নয়।” ময়মনসিংহ শাখার হিসাবে কোটি টাকার লেনদেন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার ভাইয়েরা ব্যবসা করেন। সেই টাকা এসেছে। তবে এসব নিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করার কথা নয়।”
এদিকে কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হামিদুল হক জানান, “তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
