অন্তঃসত্ত্বাদের ব্যথানাশক ওষুধ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে সমালোচনার মুখে ট্রাম্প

অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জনপ্রিয় ব্যথানাশক ওষুধ টাইলেনল (প্যারাসিটামল/অ্যাসিটামিনোফেন) এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, এই ওষুধের সঙ্গে শিশুদের অটিজমের সম্পর্ক থাকতে পারে, যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এ সংযোগ প্রমাণিত নয়। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (এফডিএ) ঘোষণা করেছে যে, প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের প্যাকেজে এমন এক লেবেল যুক্ত করা হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে যে এই ওষুধ শিশুদের অটিজম ও অতি-চঞ্চলতা বা মনোযোগহীনতার (এডিএইচডি) ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এই সতর্কবার্তার পরপরই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘টাইলেনল খাবেন না। যেভাবেই হোক খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।’ তবে তিনি আরও বলেন, ‘কখনো কখনো হয়তো এই ওষুধ খেতে হতে পারে। তখন সেটা নিয়ে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

একই সঙ্গে ট্রাম্প শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়া নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন যে, হাম, মামস ও রুবেলার মতো টিকা একসঙ্গে না দিয়ে আলাদা আলাদা দেওয়া উচিত।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এবং আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস দীর্ঘকাল ধরে প্যারাসিটামলকে গর্ভাবস্থায় নারীদের জন্য নিরাপদ ওষুধ হিসেবে সুপারিশ করে আসছে।

আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টসের প্রেসিডেন্ট স্টিভেন জে. ফ্লেইশম্যান ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় ওষুধ সেবনের সময় সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধা দুটোই বিবেচনা করতে হয়। অসংখ্য গবেষণার ফলাফল বলছে, গর্ভবতী নারীদের সুস্থতায় অ্যাসিটামিনোফেন গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ ভূমিকা রাখে।’

বিশ্বজুড়ে প্রায় অর্ধেক গর্ভবতী নারী ব্যথা কমানো বা জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল সেবন করেন। অথচ জ্বর গর্ভবতী নারী ও ভ্রূণ উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যদিও কিছু গবেষণায় প্যারাসিটামল ও অটিজমসহ স্নায়বিক সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় আকারের গবেষণাগুলোতে এ ধরনের কোনো সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি।

সুইডিশ গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক বৃহৎ গবেষণা জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, যেসব শিশু গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামলের সংস্পর্শে এসেছিল, তাদের এবং তাদের ভাইবোনদের মধ্যে কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের বায়োএথিসিস্ট আর্থার ক্যাপলান এই ঘটনাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ‘অত্যন্ত নেতিবাচক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘অটিজম নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল তথ্য, প্রমাণের অভাব, বাজে পরামর্শ ও একটি ভুয়া ব্যাখ্যা।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূলধারার চিকিৎসাবিদ্যা ট্রাম্পের এই মন্তব্য উপেক্ষা করবে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে রোগীরা ফেডারেল বিজ্ঞানকে ভরসা করতে পারছেন না, বরং অন্য নির্ভরযোগ্য উৎসে তাকাতে হচ্ছে।’

সোমবার ঘোষিত এফডিএর নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, কিছু গবেষণায় প্যারাসিটামল ব্যবহার ও অটিজমের মধ্যে ‘সম্পর্ক’ পাওয়া গেছে, বিশেষ করে যখন গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে এটি সেবন করা হয়। তবে এফডিএ স্পষ্ট করেছে যে, কারণ-সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয় এবং বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে এর বিপরীত ফলাফলও রয়েছে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, ‘অ্যাসিটামিনোফেন গর্ভাবস্থায় জ্বর কমানোর জন্য অনুমোদিত একমাত্র ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ, অথচ গর্ভবতী নারীর জ্বর সন্তানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’ আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস জানিয়েছে, অটিজমের কোনো একক কারণ জানা নেই; এটি জিনগত ও পরিবেশগত নানা উপাদানের মিলিত প্রভাবে ঘটে।

সূত্র : আল জাজিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights