মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পে চরম অব্যবস্থাপনা: ৭০ হাজার শিক্ষকের বেতন নেই ৬ মাস থমকে গেছে শিক্ষা কার্যক্রম

স্টাফ রিপোর্টার :
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প ‘নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণ শিক্ষা কার্যক্রম-এ ভয়াবহ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে ৭ম পর্যায় ভালোভাবে শেষ হলেও, ১লা জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া নতুন পর্বে চরম নৈরাজ্য চলছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষক/মডেল কেয়ারটেকার ও সাধারণ কেয়ারটেকার গত পাঁচ থেকে ছয় মাস যাবৎ তাদের মাসিক সম্মানী (বেতন) পাননি। ফলে ভেঙে পড়েছে এই বিশাল শিক্ষা কার্যক্রম।
অভিযোগ উঠেছে, ২০২৫ অর্থবছরের জন্য ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস বিভাগ থেকে প্রায় ১৩ কোটি টাকার বই ছাপা হলেও, সেগুলোর কাগজ ও কালির মান অত্যন্ত নিম্নমানের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নিম্নমানের বই ছাপার মাধ্যমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস বিভাগে কর্মরত কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে, তেমনি কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও সঠিক শিক্ষা উপকরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন (মাসিক সম্মানী) প্রদানের ক্ষেত্রেও চলছে চরম হয়রানি। প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব নম্বর সোনালী ব্যাংক থেকে রুপালী ব্যাংকে স্থানান্তরের নামে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে তাদের সম্মানী আটকে রাখা হয়েছে। আলেম-ওলামারা প্রশ্ন তুলেছেন, সোনালী ব্যাংক ও রুপালী ব্যাংক উভয়ই সরকারি ‘সুদী’ ব্যাংক। তাহলে কেন এই বিশাল সংখ্যক আলেম-ওলামাকে শুধুমাত্র ব্যাংক পরিবর্তনের নামে দীর্ঘ হয়রানির মুখে ফেলা হচ্ছে? কার স্বার্থে এই পদক্ষেপ তা নিয়েও প্রকল্পের অভ্যন্তরে চলছে তীব্র আলোচনা।

প্রকল্পের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পেছনে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের জনবল যাচাই-বাছাইয়ের নামে নানা ধরনের হয়রানি ও ‘চাদাবাজি’ শুরু হয়েছে। এমনকি, অর্থের বিনিময়ে প্রকল্প দপ্তর থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে কেন্দ্র বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে প্রকল্পের শেষ মেয়াদে উপ প্রকল্প পরিচালক মোঃ জাকের হোসাইন অর্থের বিনিময়ে শতাধিক কেন্দ্র বরাদ্দ দিয়েছেন। এখান থেকে তিনি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনুমোদন পাওয়া বহু কেন্দ্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নেই, নেই পাঠদানের পরিবেশ বা শিক্ষার্থী। এর ফলে জেলার উপ-পরিচালক ও বিভাগীয় পরিচালকরা বিপাকে পড়েছেন।

দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ দেশের ৫৬০টি মডেল রিসোর্স সেন্টার ও ১৫০০টি সাধারণ রিসোর্স সেন্টারের নামে অফিস থাকলেও কোনো আসবাবপত্র বা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। অথচ প্রকল্প দপ্তরের উপ প্রকল্প পরিচালক রশিদ আল মামুনসহ কতিপয় কর্মকর্তা সরকারি বন্ধের দিনেও (শুক্র ও শনিবার) কেন্দ্র পরিদর্শনের নামে শিক্ষক ও কেয়ারটেকারদের হয়রানি করছেন। সরকারি ছুটির দিনে কেন্দ্র খোলা রাখা সম্ভব নয় জানালে, উপ প্রকল্প পরিচালক রশিদ আল মামুনের বিরুদ্ধে খারাপ আচরণের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া, টিএ-ডিএ সুবিধা নেওয়ার জন্য ঘন ঘন পরিদর্শন হলেও গত ২০ বছরে কোনো কেন্দ্র বা রিসোর্স সেন্টারের কোনো প্রকার উন্নতি হয়নি বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পেয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেশের আলেম সমাজ এই ভয়াবহ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টেনে ধরতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে হলে, উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্ত করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায়, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণ শিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights