ঘোষণা দিয়ে চলছে আচরণবিধি লঙ্ঘন

‎
‎
‎ রাকিব মাজহার, জবি প্রতিনিধি :
‎
‎জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনের সময় যতোই এগিয়ে আসছে, ততই প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের নতুন নতুন ঘটনা সামনে আসছে। আচরণবিধি ভঙ্গ যেন এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার সমর্থিত প্যানেল থেকে শুরু করে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল; প্রায় সব প্যানেলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশ্নারের বিরুদ্ধেও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, আচরণবিধি মানার চেয়ে ভঙ্গ করাতেই যেন প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। এতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, বারবার আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও ব্যবস্থা নিতে অনেকটাই নির্বিকার নির্বাচন কমিশন। এতে নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক প্রার্থী।
‎
‎জানা গেছে, গতকাল রবিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ক্যান্সার আক্রান্ত শিক্ষার্থী মীর নূর নবীর চিকিৎসার জন্য আয়োজিত চ্যারিটি কনসার্টে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেলের জিএস প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পাদক প্রার্থী তাকরিম আহমেদ প্রকাশ্যে মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন, অনুদান ঘোষণা করেন এবং নিজেদের জন্য দোয়া চান। যা স্পষ্টতই নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপত্রে স্পষ্ট শর্ত ছিল—মঞ্চে কোনো প্যানেল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী উপস্থিত থাকতে পারবেন না। এর লঙ্ঘন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উল্লেখ ছিল কনসার্ট আয়োজনের অনুমতিপত্রে।
‎
‎এদিকে, ভূমিকম্পের কারণে সাতদিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আজ সোমবার বাড়ি পৌছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এজন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে বাস সার্ভিস চালু করা হয়। এই সুযোগে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের প্রতিযোগিতায় নামে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেলের প্রার্থীড়া। তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন শুরু করেন। ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী একেএম রাকিব এর নেতৃত্বে এদিন সকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। এমনকি ছাত্রদল সমর্থিত এই প্যানেলের পক্ষ থেকে আলাদা করে বাসেরও ব্যবস্থা করা হয়। এরপর এতে যোগ দেয় ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেলও। চাহত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ৭ বিভাগে ৭ টি বাস দেওয়া হয়। যা স্পষ্টতই আচরণবিধির লঙ্ঘন। নির্বাচনী আচরণবিধির ১১(ঙ) ধারা অনুযায়ী ভোটারকে খাদ্য, পানীয় বা উপঢৌকন দেওয়া নিষিদ্ধ। এ ঘটনায় সেই বিধি সরাসরি লঙ্ঘিত হয়েছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবিক আয়োজনকে নির্বাচনী প্রভাব বিস্তারের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হয়েছে। এর বাইরে আরও অভিযোগ রয়েছে। ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী খাদিজাতুল কুবরা ছাত্রীহলের বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে স্যানিটারি প্যাড, মগসহ নানা উপহার বিতরণ এবং নিজের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেছেন—এমন অভিযোগ প্রমাণসহ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ আচরণবিধির ৫(গ) ধারায় বলা আছে—মনোনয়ন বিতরণের আগের দিন থেকে ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এই ধারা অনুযায়ী উপহার বিতরণ তো দূরের কথা, এসব কক্ষে প্রচারণাও নিষিদ্ধ।
‎
‎এদিকে, খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এমঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসকের বিরুদ্ধেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, কয়েকদিন আগে স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী উম্মে মাবুদা মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর একটি ছবি পোশট করলে সেখানে কমেন্ট করে সমাজকর্ম বিভাগ পরিবারের পক্ষ থেকে শুভকামনা জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড মোস্তফা হাসান। এদিকে, গতকাল রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি পৌঁছে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ব্যবস্থা নিয়ে করা এক ফেসবুক পোশটে কমেন্ট করে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার সমর্থিত প্যানেলের তিন প্রার্থীকে এর জন্য ক্রেডিট দিয়ে কমেন্ট করে ধন্যবাদ জানান পরিবহন প্রশাসক ড তারেক বিন আতিক। উভয় ঘটনায় নির্বাচনী আচরণবিধি ৬ (ঙ) অনুসারে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
‎
‎এদিকে, নির্বাচনী আর্থিক ব্যয়সংক্রান্ত বিধানও কড়া। বিধি ১৭(ক)-তে বলা আছে কেন্দ্রীয় সংসদের প্রার্থী সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা এবং বিভাগীয় হল সংসদ প্রার্থী সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ব্যয় করতে পারবেন। কিন্তু গতকাল রাতে আয়োজিত কনসার্টে প্রকাশ্যে লাখ টাকার ঘাটতি দূর করার ঘোষণা, বিভিন্ন উপহার বিতরণ—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ ব্যায়ের অভিযোগ উঠেছে। যদি অতিরিক্ত ব্যয়সংক্রান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, বিধি ১৭(খ) অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথাও রয়েছে।
‎
‎সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, আচরণবিধি মেনে প্রচারণা করার চেয়ে নিয়ম ভঙ্গ করেই প্রচারণার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন অনেক প্রার্থী। তারা অভিযোগ করছনে, নির্বাচন কমিশন তার শক্ত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন। তারা বলছেন, আচরণবিধি ভঙ্গের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে নিতে কমিশনকে এখনই দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে নির্বাচনের আগেই সার্বিক পরিবেশ বিতর্কিত হয়ে পড়বে।
‎
‎
‎অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ছাত্রদল-ছাত্র পধিকার সমর্থিত প্যানালের ভিপি প্রার্থী একেএম রাকিব দাবি করেন, দুর্যোগ পরিস্থিতিতে তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা অস্বাভাবিক একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই সংকটে একে অপরকে সহযোগিতা করা উচিত। নির্বাচন কমিশন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে বলে আশা করি।”
‎
‎অন্যদিকে এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান বলেন, এসব অভিযোগ তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে এবং প্রমাণপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়ে আইন রয়েছে। চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন হয়েছে—সেখানে এমন পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আমরা সেগুলোও যাচাই করছি। শিক্ষার্থীদের পরিবহনের নামে কিছু সংগঠন বা প্যানেল নানা কার্যক্রম চালাতে চেয়েছিল, আমরা তা নিষিদ্ধ করেছি। খুব শিগগিরই বৈঠক করে এসব অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
‎
‎

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights