৪০ দপ্তর সংস্থায় প্রধান পাচ্ছে না জনপ্রশাসন

ওয়াজেদ হীরা

সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় প্রধানের পদ খালি। এ রকম প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান চলছে অতিরিক্ত দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার মতো যোগ্য কর্মকর্তা খুঁজে পাচ্ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে রুটিন কাজ চললেও কাজে গতি নেই। অনেকটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষপদ খালি থাকা মানে জনসেবা বিঘ্ন হওয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনো কোনো দপ্তরপ্রধানের পদ আট মাস, কোথাও পাঁচ মাস, কোথাও তিন মাস ধরে খালি। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও অধিদপ্তর বা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও শীর্ষপদে কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক পদে কাউকে রুটিন দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত দিয়ে এসব সংস্থা চালানো হচ্ছে। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। খালি থাকা এসব পদে মূলত নিয়োগ হয় অতিরিক্ত সচিব পদ থেকে। কখনো কখনো গ্রেড-১-কেও দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জনপ্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দপ্তর বা সংস্থায় কাউকে পদায়ন দিতে না পারায় রুটিন কাজ করতে ভারপ্রাপ্ত দেওয়া হয়েছে। অনেক স্থানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার আর্থিক ক্ষমতা নেই। অনেক কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত হলেও অন্য কর্মকর্তা সমমানের হওয়ায় চেইন অব কমান্ডে সমস্যা হচ্ছে। যার সার্বিক প্রভাব পড়ছে প্রতিষ্ঠানটির ওপর। সারা দেশের নার্সদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর।

অথচ আগস্ট থেকে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে মহাপরিচালক নেই গত বছরের ডিসেম্বর থেকে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ গত মার্চ থেকে খালি একজন যুগ্মসচিব দিয়ে চালানো হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের পদও খালি। এ ছাড়া ডিএনএ ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তরে প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শকের পদও খালি রয়েছে।

জনপ্রশাসন থেকে জানা গেছে, চিনি খাদ্য করপোরেশন, বাংলাদেশ রাবার বোর্ড, পাট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধান ইউনিট, শ্রম অধিদপ্তর, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থা, শিশু একাডেমি, গোপালগঞ্জ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের হাইড্রোকার্বন ইউনিটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভারপ্রাপ্ত বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চলছে।

জনপ্রশাসনের সরকারি কর্মচারী বাতায়ন তথ্যানুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত গ্রেড-১ কর্মকর্তা আছেন ১৩ জন আর অতিরিক্ত সচিব আছেন ৩২৭ জন। প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের বর্তমান পদ ৪১৮টি। কর্মরত আছেন ৩২৭ জন। মূলত অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা কমে থাকায় বিভিন্ন দপ্তর, পরিদপ্তর বা সংস্থায় নিয়োগ করতে পারছে না জনপ্রশাসন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও চলছে নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে কম অতিরিক্ত সচিব দিয়ে। মন্ত্রণালয়গুলোতে একজন অতিরিক্ত সচিব অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সেখানে মন্ত্রণালয় খালি করে নতুন কোথাও নিয়োগ হতে দিতে নারাজ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবরাও। এ কারণে অধিদপ্তর বা সংস্থাগুলোর প্রধান হিসেবে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা পাচ্ছে না জনপ্রশাসন।

২০ ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর সে ব্যাচ যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছে। এ ব্যাচের কর্মকর্তারা চার বছর ধরে একই পদে রয়েছেন। ইতোমধ্যে পদোন্নতির কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বাসা) নেতারা মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘অনেক জায়গায় কর্মকর্তার পদ খালি। অতিরিক্ত সচিবের কাজ তো যুগ্মসচিব দিয়ে হবে না। নিয়মিত যেন পদোন্নতিটা হয় সেটি আমরা বলেছি।’

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান ভারপ্রাপ্ত বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে অল্প দিন চালানো যায়। দীর্ঘ সময় চালানো ক্ষতিকর। কারণ ভারপ্রাপ্ত বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও থাকে না। এতে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে জনসেবা ব্যাহত হয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights