পাতাল থেকে বেরিয়ে আসলো ৭০ হাজার সাপ

অনলাইন ডেস্ক
মানিটোবা, কানাডার বরফঢাকা প্রেইরির এক শান্ত, নির্জন অঞ্চল। কিন্তু বসন্ত এলেই সেই নীরবতা হঠাৎ ভাঙে। মনে হয় যেন পৃথিবীর নিচে থাকা কোনো ঢাকনা খুলে গেছে। পাতালের ফাটল, চুনাপাথরের সুড়ঙ্গ আর গুহা থেকে একসঙ্গে ছুটে আসে হাজারে হাজার সাপ—সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি।

মানুষের ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে নার্সিস স্নেক ডেনস এমন এক অভিজ্ঞতা, যা জীবনে একবার দেখলে ভুলে থাকা যায় না।

নার্সিসের নিচে বিস্তীর্ণ চুনাপাথরের গুহা। উপরে পাতলা মাটির স্তর। শীত পড়লেই তাপমাত্রা নামতে থাকে হিমাঙ্কের ৩০–৪০ ডিগ্রি নিচে। তখন বাঁচার আর কোনো রাস্তা নেই। তাই রেড-সাইডেড গারটার সাপরা দল বেঁধে নেমে যায় সেই পাতালের গুহায় শীত কাটাতে। পুরো শীতজুড়ে চলে এদের হাইবারনেশন। গুহার সামান্য উষ্ণ পরিবেশটাই তাদের টিকে থাকার ভরসা।

বরফ গলতে শুরু করতেই গুহার ভেতর নড়াচড়া শুরু হয়। প্রথমে জেগে ওঠে পুরুষ সাপেরা। এরপর বেলা বাড়লে তারা উঠে আসে মাটির ওপর রোদ নিতে। বাকি সময়টা অপেক্ষা—মেয়ে সাপদের বের হওয়ার।

মেয়ে সাপেরা ওপরে উঠতেই শুরু হয় প্রকৃতির এক বিস্ময়কর দৃশ্য—‘মেটিং বল’। একটি মাত্র মেয়ে সাপকে ঘিরে শত শত পুরুষ সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলে। দেখতে মনে হয় নড়তে থাকা সাপ দিয়ে তৈরি কোনো জীবন্ত গোলক। সময়-সংকেত, ফারোমোন আর প্রবৃত্তির নিখুঁত সমন্বয়ে চলে এই পূর্ণ প্রজনন-অনুষ্ঠান। কয়েক দিন স্থায়ী হয় এই অদ্ভুত নাটক। এ সময় পুরুষ সাপেরা খাওয়াদাওয়াও বন্ধ রাখে।

কেন নার্সিসই এই সাপদের রাজধানী—তার কারণ প্রকৃতিতেই লুকানো। চুনাপাথরের গুহা শীতে ঠিকঠাক উষ্ণতা ধরে রাখে; খুব ঠান্ডা জলবায়ুতে উপরে বাঁচা সম্ভব নয়; আর হাজার হাজার সাপ একসঙ্গে থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

একসময় স্থানীয় ইউরোপীয় বসতকারীরা বিরক্ত হয়ে অনেক সাপ মেরে ফেলত, সরিয়ে দিত, এমনকি বাণিজ্যিকভাবেও সংগ্রহ করত। এতে ১৯৮০-এর দশকে সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। পরে বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেন। ম্যানিটোবা ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস এলাকা সংরক্ষণ ঘোষণা করে। তৈরি হয় স্নেক ফেন্স, স্নেক টানেল, পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম। এখন এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গারটার সাপ সংরক্ষণকেন্দ্র।

নির্বিষ এই সাপ দেখতে বসন্তজুড়ে পর্যটকদের ভিড় থাকে দেবে দেবে। স্কুলের বাস আসে, প্রকৃতিপ্রেমীরা ক্যামেরা হাতে দাঁড়ায়। উইনিপেগ থেকে দূরত্ব মাত্র ১০০ কিলোমিটার। পার্কের ভেতরের সারা আর স্যাম নামের দুটি বিশাল সাপের ভাস্কর্য দেখলেই বোঝা যায়—এলাকার প্রধান পরিচয় এখন সরীসৃপই।

সবচেয়ে ভালো সময় এপ্রিলের শেষ থেকে মে’র প্রথম সপ্তাহ। বরফ গলার পর ১০–১২ দিন। রোদ থাকলে সাপ বেশি বেরোয়। মেঘলা দিনে থাকে পাতালেই।

শেষ পর্যন্ত নার্সিসে দাঁড়ালে ভয়টা কেমন জানি বদলে যায়। এখানে সাপ মানে আতঙ্ক নয়—হাজার বছরের বিবর্তন আর প্রকৃতির নিখুঁত পরিকল্পনার জীবন্ত প্রমাণ। তাদের পাতালের এই অদ্ভুত রাজ্যেও লুকানো আছে প্রকৃতির বিশাল সৌন্দর্য।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights