মাদক মাফিয়া এল চ্যাপোর জীবন যেন জীবন্ত ক্রাইম থ্রিলার

অনলাইন ডেস্ক
একবার নয়, দুই দুই বার! মেক্সিকোর সবচেয়ে সুরক্ষিত কারাগারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে উধাও হলেন আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের কুখ্যাত সম্রাট হোয়াকিন আর্কিভ্যালদো গুজম্যান লোয়েরা। যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত এল চ্যাপো নামে। তার দ্বিতীয়বারের এই জেল পালানো অভিযানকে বিশ্বের সবচেয়ে দুঃসাহসিক ঘটনা বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।

ছোটখাটো চেহারার জন্য এল চ্যাপো নামে পরিচিত এই মাদক মাফিয়া একসময় আন্তর্জাতিক পত্রিকা ফোর্বসের প্রচ্ছদেও স্থান পেয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম ধনী হিসেবে। মাদক পাচার থেকে শুরু করে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত এই অপরাধীর সাম্রাজ্য দক্ষিণ আমেরিকা ছাড়িয়ে ছড়িয়েছিল খোদ আমেরিকাতেও।

২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার গ্রেফতারের পর এল চ্যাপোকে রাখা হয়েছিল মেক্সিকোর হাই প্রোফাইল কারাগার আল্টিপ্লানোতে। এই জেলের কুঠুরি ছিল কংক্রিটের দুর্ভেদ্য দেয়ালে ঘেরা, যেখানে বসানো ছিল সেন্সর ও ২৪ ঘণ্টার সিসিটিভি নজরদারি। কিন্তু সেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাও আটকাতে পারেনি অসম্ভব চতুর এল চ্যাপোকে।

জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে ধৈর্য ধরে পালানোর ছক কষছিলেন তিনি। স্ত্রী এমা কোরোনেল আইপুরোর মাধ্যমে বাইরে যোগাযোগ স্থাপন করে ১৫২১ মিটার লম্বা একটি সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পরিকল্পনা করেন। জেলের কক্ষে সিসিটিভি থাকলেও শৌচাগার ছিল ক্যামেরা মুক্ত। এই সুযোগটাই কাজে লাগান চ্যাপো। শৌচাগারের মেঝের ঠিক নিচ থেকেই খোঁড়া হয়েছিল সুড়ঙ্গের মুখ।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে শৌচাগারে যাওয়ার নাম করে একটি চৌকো সঙ্কীর্ণ গর্ত দিয়ে তিনি নেমে যান সুড়ঙ্গে। সেখানে তাঁর শাগরেদরা তৈরি রেখেছিল আলো ও সুড়ঙ্গ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য একটি বাইক! কারারক্ষীদের তার কক্ষ ফাঁকা দেখে যখন টনক নড়ে, ততক্ষণে বাইকে চড়ে সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে গেছেন এই দুর্ধর্ষ মাফিয়া। এই ঘটনা মেক্সিকো সরকারের মুখে চুনকালি লেপে দেয়।

এল চ্যাপোর উত্থানের কাহিনিও যেন হলিউড ছবির মতো। মেক্সিকোর সিনালোয়ায় হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি ১৫ বছর বয়সে বাবার অবৈধ গাঁজা চাষে হাত পাকান। এরপর গড়ে তোলেন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী সিন্ডিকেট সিনালোয়া কার্টেল।

মার্কিন সীমান্তে মাদক পাচারের জন্য তার বাহিনী মাটির নিচে কয়েকশো মিটার লম্বা সুড়ঙ্গ তৈরি করত, যেখানে আলো ও বায়ু-নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা ছিল। ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষকে খুনের নেপথ্যে তাঁর সংগঠনের হাত রয়েছে বলে ধারণা তদন্তকারীদের।

দ্বিতীয়বার পালানোর পর মেক্সিকো প্রশাসনকে দীর্ঘ ছ’মাস ধরে নাজেহাল করেন এল চ্যাপো। অবশেষে তার কার্টেলেরই কয়েক জন সদস্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিনালোয়ার কুলিক্যানের লস মোচিসের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আবার তাকে গ্রেফতার করে মেক্সিকো সেনা। এই অভিযানে ৫ জনের মৃত্যু হয়।

আইনি জটিলতার পর এই মাদক-ত্রাসকে অবশেষে আমেরিকায় প্রত্যর্পণ করা হয়। নিউ ইয়র্কের কড়া পাহারার জেলে তার বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় ৫৬ জন মাদক মাফিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন ছিলেন তাঁরই একসময়ের সঙ্গী।

তবে তার এই জেল পালানোর গল্প এখনও বিশ্বের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযান হিসেবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights