শীতে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চল, ব্যাহত কৃষিকাজসহ জনজীবন
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
ঘন কুয়াশা ও কনকনে ঠান্ডায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের জনজীবন। নেহাত প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। রাত-দিন চারদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকছে, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমেল বাতাস।
শরীরে উষ্ণ বস্ত্র জড়িয়েও শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই মিলছে না। গ্রামাঞ্চলে শীতার্ত মানুষ দল বেঁধে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে বাধ্য হচ্ছেন। রংপুর অঞ্চল হিমালয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় এ এলাকায় শীতের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। সাধারণত সূর্যের দেখা মিললে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। তবে গত মঙ্গলবার থেকে সূর্য কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়ে রয়েছে। দিনভর সূর্যের দেখা না মেলায় শীতের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা। মাঠে ভুট্টা, সরিষা, গম, আলু এবং আমনের বীজতলা থাকলেও কনকনে ঠান্ডার কারণে তারা নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না। কেউ কেউ ঠান্ডা উপেক্ষা করে মাঠে নামলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারছেন না।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার দলগ্রামের কৃষক হায়দার আলী জানান, তিনি দশ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। খেতের পরিচর্যা জরুরি হলেও বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনজন শ্রমিক নিয়ে মাঠে নেমে এক ঘণ্টাও কাজ করতে পারেননি। তিনি বলেন, আকাশে যদি সূর্য থাকত, তাহলে এত কাবু হতাম না। সূর্য না থাকায় ঠান্ডা সহ্য করা যাচ্ছে না।
হাতীবান্ধার ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের অটোরিকশা চালক আবেদ আলী বলেন, ঘন কুয়াশার কারণে সকাল ১০টার আগে যাত্রী পাওয়া যায় না। কুয়াশার জন্য বের হতে খুব সমস্যা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন দিনমজুর, ছিন্নমূল ও নদীপাড়ের চরাঞ্চলের মানুষজন। তাদের অনেকেরই পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাক নেই। সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কম দামে উষ্ণ পোশাকের আশায় তারা শহরের ফুটপাতে বসা ‘ফাটা কোম্পানি’ দোকানে ভিড় করছেন। সেখানে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় কম্বল ও জ্যাকেট মিললেও সবার পক্ষে কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
কালীগঞ্জের কাকিনা চাপারতল গ্রামের আজো বালা বলেন, একটা চাদর ছাড়া কিছুই নেই। ঠান্ডায় ঘর থেকে বের হতে পারছি না। মেম্বারের কাছে গিয়েও ঘুরে এসেছি।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার জানান, প্রথম ধাপে ৯ হাজার ৬০০টি এবং দ্বিতীয় ধাপে আরও ৫ হাজার কম্বল পাওয়া গেছে। চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় অতিরিক্ত ৫০ হাজার কম্বলের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তিনি নিজে দুর্গম এলাকায় গিয়ে কম্বল বিতরণ করছেন বলেও জানান।
রংপুর আবহাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ৯টায় নীলফামারীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রংপুরে ১১.৫, লালমনিরহাটে ১১.৬, কুড়িগ্রামে ১১.৪, গাইবান্ধায় ১২.১, সৈয়দপুরে ১১.৪, পঞ্চগড়ে ১১ এবং দিনাজপুরে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কনকনে ঠান্ডার সঙ্গে হিমেল বাতাস থাকায় শীতের প্রকোপ বেড়েছে। সূর্যের অনুপস্থিতিতে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও কমে গেছে। এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় জানান, ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে কৃষিকাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকরা চেষ্টা করছেন কাজ চালিয়ে যেতে, তবে এ সময়ে কৃষিশ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
