ফের বেপরোয়া পাথরখেকোরা

শাহ্ দিদার আলম নবেল, সিলেট

সিলেটে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পাথরখেকো সিন্ডিকেট। বাকি সব কোয়ারিতে চুরি প্রায় বন্ধ থাকলেও কোম্পানীগঞ্জের সারপিন টিলায় চলছে লুটের মহোৎসব। শতাধিক ‘বোমা’ মেশিন দিয়ে ৫০-৬০ ফুট গর্তের নিচ থেকে তোলা হচ্ছে পাথর। দিনের আলোতে চলে পাথর উত্তোলন আর রাতে পরিবহন করে নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন ক্রাসার মেশিনে। পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতিদিন অভিযান চালানো হলেও কোনোভাবেই থামছে না এই লুট। প্রশাসনের চেয়ে যেন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে পাথরখেকো সিন্ডিকেট। সাদাপাথর লুটকাণ্ড আলোচিত হয়েছিল সারা দেশে। গত বছরের আগস্টে পাথর লুটকাণ্ডে যখন সিলেট উত্তপ্ত তখন জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন র‌্যাবের একসময়কার আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। তার কঠোর হস্তক্ষেপে সিলেটের সবকটি কোয়ারি থেকে পাথর চুরি বন্ধ হয়। লুটকৃত সাদাপাথর উদ্ধার করে প্রতিস্থাপন করা হয়। ওই সময় কিছুদিনের জন্য কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা (সারপিন টিলা) থেকে পাথর লুট বন্ধ হয়। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতে ফের লুটেরা চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত বছরের নভেম্বরের প্রথম দিকে সারপিন টিলা পরিদর্শনে গিয়ে লুটপাটের ক্ষতচিহ্ন দেখে হতবাক হন তিনি। পাথর লুট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্টদের। জেলা প্রশাসকের সেই নির্দেশনার পর স্থানীয় প্রশাসন কঠোর হলেও তাতে পাত্তা দিচ্ছে না লুটেরা চক্র। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ওই চক্র টিলাকে পুকুর বানিয়ে লুট করছে পাথর। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পাথরখেকো ওই সিন্ডিকেটে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জালিয়ারপাড়, চিকাডহর, ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। লুট সিন্ডিকেটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পদধারী নেতাও রয়েছেন। ওই চক্র ১০০-১৫০ ফুট উঁচু টিলাকে পুকুর আকৃতি করে ফেলেছে। এখন ৫০-৬০ ফুট গর্তের নিচ থেকে ‘বোমা’ মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করছে। দিনের বেলা শতাধিক মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করে জড়ো করে রাখা হয় টিলার পার্শ্ববর্তী এলাকায়। আর রাতের আঁধারে ট্রাক্টর দিয়ে সেই পাথর নিয়ে যাওয়া হয় ভোলাগঞ্জ ও পাড়ুয়া এলাকার বিভিন্ন ক্রাসার মেশিনে। পরবর্তীতে ভেঙে সেই পাথর বিক্রি করেন ক্রাসার মালিকরা। সূত্র আরও জানায়, সারপিন টিলায় পাথর লুট বন্ধে প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালায়। অভিযানকালে পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত ‘বোমা’ মেশিন ধ্বংস করার পাশাপাশি উত্তোলনে নিয়োজিত লোকজনকেও আটক করা হয়। কিন্তু আটকরা শ্রমিক হওয়ায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় লুট সিন্ডিকেটের হোতারা। আর কয়েক দিনের মধ্যেই ধ্বংস করা মেশিন মেরামত করেই পুনরায় নামানো হয় পাথর উত্তোলনের কাজে। মাঝে-মধ্যে ক্রাসার মেশিনগুলোতেও অভিযান চালিয়ে লুটের পাথর জব্দের পাশাপাশি মেশিন ধ্বংস ও জরিমানা করা হয়। গত ১৫ দিনে পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত অন্তত অর্ধশত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। প্রশাসনের এত কঠোরতার পরও কোনোভাবেই যেন থামানো যাচ্ছে না লুটপাটকারীদের।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, সারপিন টিলায় পাথর লুট বন্ধে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। আগের দিন অভিযান হলে পরের দিন লুটেরা চক্রের সদস্যরা ফিরে আসে। এলাকার অধিকাংশ মানুষ এই পাথরের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না লুট। গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজনকে পাথর লুটের ঘটনায় আটক করা হয়েছে। লুট সিন্ডিকেটের ৪৭ জন হোতার নামে মামলাও হয়েছে। কিন্তু এরা এলাকায় না থাকায় গ্রেপ্তার করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights