শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ব্যবহৃত উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির (পিএসসি) ২০২৫ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে সেই খসড়া ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। অভিযোগ উঠেছে, এই খসড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে শ্রম আইন ও শ্রমবিধি সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ‘শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ)’ থেকে সমুদ্রভিত্তিক তেল-গ্যাস খাতকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পিএসসি পর্যালোচনায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি শ্রমিকের জন্য বরাদ্দ থাকা ডব্লিউপিপিএফ না রাখার সুপারিশ করতে যাচ্ছে। অথচ গতবার অফশোর বিডিংয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দরপত্রে অংশগ্রহণ না করার কারণ বের করতে যে কমিটি হয়েছিল তারা কোম্পানিগুলোর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে ডব্লিউপিপিএফের বিষয়টি উঠিয়েছিল। বিদেশি কোম্পানিগুলো পিএসসিতে ডব্লিউপিপিএফ বিষয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বিষয়ে জানিয়েছিল। শ্রমিকসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবাই বলেছেন, শ্রম মন্ত্রণালয়সহ ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ ছাড়া ডব্লিউপিপিএফ না রাখা হলে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘন হবে। এটি দেশি এবং আন্তর্জাতিক যে নিয়মনীতি আছে তারও পরিপন্থি।
বাংলাদেশে ২০০৬ সালে আইন করে শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী শ্রমিকের কল্যাণে প্রত্যেক কোম্পানি তার লাভের একটা অংশ তহবিলে জমা দিতে বাধ্য। এ বাধ্যবাধকতা থাকায় দেশিসহ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রতি বছর এই তহবিলে তাদের লাভের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে থাকে। সে অর্থ দিয়ে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে খরচ করা হয়। শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষায় সব কোম্পানির ক্ষেত্রে এই আইন মেনে চলা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরাও। আইএলও-এর পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে আইন করে এই তহবিল গঠনে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। ডব্লিউপিপিএফ কোনো বিনিয়োগ, রাজস্ব বা ব্যয় পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভর করে না। যখন কোনো কোম্পানি নিট লাভ ঘোষণা করে শুধু তখন কার্যকর হয়। জানা যায়, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে সরকার সম্প্রতি উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির (পিএসসি) যে খসড়া তৈরি করছে সেখানে শ্রম আইন ও বিধি সংশোধন করে এই খাতকে ডব্লিউপিপিএফ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আলোচনা হচ্ছে।
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির খসড়া পর্যালোচনা করতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ একটি কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান এই কমিটির প্রধান। কমিটিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞসহ পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আছেন। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। এই কমিটির একজন সদস্য এবং তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) প্রকৌ. মো. শোয়েব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের শ্রমিকরা ডব্লিউপিপিএফের বিষয়টি দাবি করছেন। এটি নিয়ে শেভরন ও তাল্লোর মামলাও আছে। এখন পর্যন্ত এই কমিটির একটি মাত্র বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে এই বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।। কমিটির সদস্যরা আগের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। গতবার অফশোর বিডিংয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দরপত্রে অংশগ্রহণ না করার কারণ বের করতে যে কমিটি হয়েছিল তারা কোম্পানিগুলোর কাছে এর কারণ জানতে চাইলে ডব্লিউপিপিএফের বিষয়টি উঠিয়েছিল। তাদের মতে, এটা থাকা উচিত আর এ ব্যাপারে আমাদের পিএসসিতে কোনো কিছু স্পষ্টভাবে বলাও নেই। পরের বৈঠকগুলোতে এ বিষয়ে কথা উঠলে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে যে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তির খসড়া আছে তা আন্তর্জাতিক মানের। বিদেশি কোম্পানিকে যথেষ্ট সুবিধা দিয়েই এই খসড়া করা হয়েছে। তার মধ্যে শ্রমিকের সুবিধা বাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডব্লিউপিপিএফ বাদ দেওয়া হলে বাংলাদেশের শ্রমজীবীদের অধিকার ব্যাপক আকারে ক্ষুণ্ন হবে। আর সেটা আইনগতভাবেই ক্ষুণ্ন হবে। এটা শ্রম আইনের একেবারে পরিপন্থি। এর মাধ্যমে যদি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়া হয় তাহলে পরে এ খাতে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাই। এটি দেশি এবং আন্তর্জাতিক যে নিয়মনীতি আছে তারও পরিপন্থি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ডব্লিউপিপিএফ পিএসসির কোনো বিষয় নয়। এটি দেশের প্রচলিত একটি আইন। আইন মেনেই পিএসসি করা হবে। বাংলাদেশে অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানি ডব্লিউপিপিএফের বিধান মেনে চলে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান এই আইন এড়িয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ মুনাফা বিদেশে পাঠায়। যার ফলে সরকার বৈধ রাজস্ব এবং শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ডব্লিউপিপিএফের তহবিলের ১০ শতাংশ সরকারি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দিতে হয়, যা জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। ১০ শতাংশ যায় কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে, যা শ্রমিকদের উৎসাহ ও শিল্পে শান্তি বজায় রাখতে সহায়ক। বাকি ৮০ শতাংশ কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যার মধ্যে ৩০ শতাংশ আয়কর হিসেবে আদায় হয় এবং সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়।
