রাত পোহালে সাকরাইন উৎসব, শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে ঘুড়ি বেচাকেনা
মাহির মিলন, জবি প্রতিবেদক
রাত পোহালেই পুরান ঢাকায় শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত সাকরাইন উৎসব। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে আয়োজিত এই উৎসব পুরান ঢাকার মানুষের প্রাণের উৎসব হিসেবে পরিচিত। ভোর থেকে ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো, রঙিন ঘুড়ির লড়াই আর সুতো কাটাকাটিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সন্ধ্যার পর আতশবাজি, ফানুস ও আলোকসজ্জায় অন্যরকম রূপ নেয় আকাশ। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের মিলনমেলায় উৎসবের আনন্দ আরও বেড়ে যায়। ঐতিহ্যবাহী খাবার আর উৎসবমুখর পরিবেশে সাকরাইন পুরান ঢাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরে।

এদিকে, আজ মঙ্গলবার শেষ সময়ে পুরান ঢাকায় জমে উঠেছে ঘুড়ি কেনাবেচা। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় অনেককে অস্থায়ী দোকান ও গলিপথে ঘুরি বিক্রি করতে দেখা যায়। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণদের ঘুড়ি কিনতে ব্যস্ত দেখা গেছে। রঙিন ঘুড়ি, সুতা ও নাটাই বিক্রিতে বিক্রেতারাও দারুণ খুশি।
মঙ্গলবার সরজমিন অলিগলি ঘুরে দেখা যায়, পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার, নারিন্দা, ধোলাইখাল, ধুপখোলা, গেন্ডারিয়াসহ প্রতিটি অলি-গলি জুড়ে নানা রংয়ের ঘুড়ির পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। শেষ মুহূর্তে বেড়েছে রং-বেরংয়ের ঘুড়ি-নাটাই ও সুতার বেচাকেনা। নিজেদের পছন্দের ঘুড়ি কেনায় মেতেছে ছোট-বড় সবাই।

পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজারে আকার ও মানভেদে নানা ধরনের ঘুড়ি দেখা যায়। এর মধ্যে ভোয়াদার, চক্ষুদার, দাবাদার, রুমালদার, চিলদার, রকেট, স্টার, টেক্কা, শিংদ্বার, রংধনু, গুরুদার, পান ও লাভ ঘুড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। একেকটা ঘুড়ির সর্বনিম্ন দাম ৫, ১০, ১৫, ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ঘুড়ির সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাহারি নাটাই। মানভেদে এসবের দাম ১০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। আর মানভেদে সুতার দাম হাঁকানো হচ্ছে ৮০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।
শাঁখারি বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এবারে বেচাকেনা শুরুতে কম ছিল। কিন্তু আজ শেষ মুহূর্তে বেড়েছে। সাকরাইন আসলে আগে ঘুড়ি বেচাকেনায় ধুম পড়ে যেত শাঁখারি বাজারসহ পুরো পুরান ঢাকাতে। আগের চেয়ে দোকানের সংখ্যা বাড়ায় বেচাকেনা কমেছে। সাকরাইন উপলক্ষে আগে প্রায় ২২-২৫ লাখ টাকা বেচাকেনা হতো। কিন্তু এখন সবমিলিয়ে ১০-১২ লাখ টাকা বিক্রি হয়। আজ সারারাত থেকে শুরু করে কাল বিকেল পর্যন্ত ঘুড়ি বেচাকেনা হবে বলে আশা করছেন তারা।
শাঁখারি বাজারের মৌসুমি ব্যাবসায়ী রিপন সরকারের দোকান ঘুরে দেখা যায়, বাহারি রঙের ঘুড়ি, সুতা, ও নাটাইয়ের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন তার দোকানে। পাশাপাশি একজনে দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে “ঘুড়ি, ঘুড়ি” বলে হাকডাক দিচ্ছেন ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে।
এদিকে, শাঁখারি বাজারের ব্যবসায়ী রতন কুমার বলেন, এবারের শুরুর দিকে একটু কম হলেও বাজার এখন পুরোদমে জমে উঠেছে। আমাদের কাছে ঘুড়ি, নাটাই সুতাসহ ঘর সাজানোর যাবতীয় সাজসজ্জা রয়েছে।
সাকরাইন উৎসবকে মূলত ঘুড়ি উৎসব বা পৌষ সংক্রান্তিও বলে। একটা সময় এ উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকার সর্বমহলে দিনটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া, ধূপখোলা, দয়াগঞ্জ, মুরগীটোলা, নারিন্দা, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজার, কলতাবাজার, ধোলাই খাল, শাঁখারীবাজার, রায়সাহেব বাজার, নবাবপুর, বংশাল, নাজিরাবাজার, তাঁতী বাজার, লালবাগ ও হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে দিনটিকে ঘিরে বেশ উন্মাদনা চোখে পড়ে। গত কয়েক বছর ধরে অন্যান্য এলাকা বিশেষ করে ‘নতুন ঢাকা’ হিসেবে পরিচিত এলাকার তরুণ-তরুণীরাও এ উৎসবে যোগ দিতে ছুটে যান পুরান ঢাকায়।
সাকরাইন উৎসবের দিনে সকাল থেকেই ছাদে ছাদে শুরু হয়ে যায় ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত থাকে প্রতিটি ছাদ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উৎসবের জৌলুস। আর আকাশে বাড়ে ঘুড়ির সংখ্যা। সকালের তুলনায় বিকেলে এ উন্মাদনা পরিপূর্ণতা লাভ করে। সেই সঙ্গে আনন্দের উত্তাপকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয় ঘুড়ির কাটাকাটি খেলা। দিনজুড়ে ছাদের ওপর চলে গানবাজনা, ডিজে পার্টি ও খাওয়া-দাওয়া। সন্ধ্যা নামলে শুরু হয় আগুনের খেলা। এছাড়া, লাল-নীল আতশবাজির ঝলকানিতে ছেয়ে যায় আকাশ।
এছাড়া, সাকরাইনে পুরান ঢাকার বাসায় বাসায় বাহারি পিঠা বানানোর ধুম পড়ে। এ দিনটিতে শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের জন্য নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানোর রীতি হয়েছে। তবে এ প্রচলন এখন খুব একটা দেখা যায় না।
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মানুষের মধ্যে আগের তুলনায় ভ্রাতৃত্ব কমে গেছে। এখন নানা জটিলতায় তরুণরা সাকরাইন উৎসবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া, আধুনিক যুগের ডিজে পার্টি এবং আতশবাজির কারণে সাকরাইন ঘুড়ি উৎসব তার নিজস্ব ঐতিহ্য হারিয়েছে। বর্তমানে এই ডিজে পার্টি সাকরাইন উৎসবের অন্যতম বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এমনকি এই ডিজেপার্টিকে কেন্দ্র করে নানা নেতিবাচক ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক বছরে।
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বাশার বলেন, সাকরাইন আমাদের পূর্বসূরিদের উৎসব। এই দিনে আমরা ছোট-বড় সবাই মিলে বাড়ির ছাদে ঘুড়ি উৎসব করি। রাতের বেলায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে আতশবাজি, ফানুস ওড়ানো, হরেক রকমের লাইটিং, বাহারি খাবারসহ গান-বাজনার আয়োজন করা হয়। সাকরাইন উৎসবে সবাই মিলে আমরা অনেক আনন্দ করি।
তিনি বলেন, আজকাল সাকরাইনে অনেকে নিজেদের মত উদযাপন করে। কেউ কেউ এটাকে আধুনিক সাংস্কৃতির বেড়াজালে চাকচিক্য করে ফেলেছে। এটা মোটেও সাকরাইনের মূল সঙ্গ ছিল না। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এমনটা হয়ে গেছে।
ঢাকার স্থানীয়রা জানান, এবার ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি দুই দিনব্যাপী সাকরাইন উদযাপনের কথা ছিল। তবে কেবল ১৪ জানুয়ারিই একদিন উদযাপন হবে উৎসবটি।
সাকরাইন উৎসব মূলত পৌষ সংক্রান্তি। এটি বাংলা ক্যালেন্ডারের পৌষ মাসের শেষ দিনে (সাধারণত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি বছর ১৪ বা ১৫ জানুয়ারি) পালন করা হয়। আজ ১৩ জানুয়ারি, অর্থাৎ আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি পুরান ঢাকায় এই উৎসবের মূল আমেজ শুরু হতে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক সূত্রমতে, ১৭৪০ সালে মোগল আমলে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের শাসনামলে পুরান ঢাকায় ঘটা করে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন শুরু হয়।
