ওষুধের বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে

বিশেষ প্রতিনিধি

গত ৮ জানুয়ারি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বড় করে সরকার। এ তালিকায় এখন ওষুধের সংখ্যা ২৯৫। এসব ওষুধ সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হবে বলে সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতিরও অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এ বিষয়ে সংবাদ ব্রিফিং করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান। অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করা হয়েছে। এখন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ২৯৫। এ ওষুধগুলোর মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে। তালিকায় থাকা এসব ওষুধ দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মেটাবে এবং এসব ওষুধ দেশের মানুষের ৮০ শতাংশ রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু সরকারি এ সিদ্ধান্তের তিন সপ্তাহ পরও বাজারে এসব ওষুধ সরকারের নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে না। দোকানে গেলে প্রথমেই বলা হচ্ছে, ওষুধটি নেই। তার পর যখন ক্রেতা অনুরোধ করছেন তখন আগের দামে ওষুধ কিনতে আগ্রহী হলে দিতে পারবেন বলে জানাচ্ছেন বিক্রেতা। একজন ভুক্তভোগী বললেন, সরকার কেবল ওষুধের দাম নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। কিন্তু নির্ধারিত দামে বাজারে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করছে না। ফলে, সরকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েনি বাজারে। সিন্ডিকেটের কারণে বাজার থেকেই উধাও হয়ে যাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ। এতে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে নাভিশ্বাস উঠছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দেশে ওষুধের বাজারে গত কয়েক মাসে তিন দফায় মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। কোনো কোনো ওষুধের মূল্য বেড়েছে দ্বিগুণ। আবার দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনোটা বেড়েছে আরও বেশি। এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় খাবারের চেয়ে চিকিৎসা ব্যয় দ্বিগুণ ছাড়িয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে। এভাবে ওষুধবাণিজ্যেও অদৃশ্য সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের হাতে বন্দি হচ্ছে। বাংলাদেশে মূলত ছয়টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা সবচেয়ে বেশি ওষুধ উৎপাদন করে। এ ছয়টি কোম্পানির কাছে জিম্মি জনগণ। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যখন যেভাবে পারছে ওষুধের দাম নির্ধারণ করছে। তাদের নির্ধারিত মূল্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলেই বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাওয়া যাচ্ছে না অতি জরুরি ওষুধ। ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ছয় কোম্পানির এ সিন্ডিকেট।

এ তো গেল বৈধ ওষুধ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের জনগণের জন্য একেই তো ওষুধের দাম লাগামহীন, তার ওপর ভেজাল ওষুধে সয়লাব বাজার। ঢাকায় পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও মফস্বলের বাজার ভেজাল ওষুধে সয়লাব। ভেজাল ও নকল ওষুধ বিক্রিতেও গড়ে উঠেছে ভয়ংকর সিন্ডিকেট।

জীবন রক্ষাকারী ভেজাল ও নকল ওষুধ খেয়ে কিডনি, ক্যানসারসহ নানা ধরনের রোগে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সি মানুষ ব্যাপক হারে আক্রান্ত হচ্ছে। ভেজাল ও নকল ওষুধ সেবন দেশে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে ওষুধের বৃহত্তম মার্কেট অবস্থিত। সেখান থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে বেশির ভাগ ওষুধ পাইকারি কিনে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। মিটফোর্ড ওষুধ মার্কেটে অর্ধশতাধিক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। একাধিক ব্যবসায়ী এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ সিন্ডিকেট নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন এবং বাজারজাত করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ওষুধ বিক্রয়, বিতরণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ফার্মাসিস্টদের। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৯০ ভাগ দোকানে ফার্মাসিস্ট নেই। বছরের পর বছর ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে নৈরাজ্য চলে আসছে। ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করলেও দৃশ্যমান কিছু চোখে পড়ছে না বলে জানিয়েছেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা। বিদেশি ওষুধের নকলই বেশি হচ্ছে। বিদেশি বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ নকল করে বাজারজাত করে আসছে অসৎ ওই সিন্ডিকেট। এদের সঙ্গে ওষুধ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবেই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি বাংলাদেশের মানুষ। একদিকে যেমন, কয়েকটি কোম্পানির সিন্ডিকেটের কারণে নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের বাজার। অন্যদিকে নকল ওষুধের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। শেষ পর্যন্ত, জনগণ কি নিরাপদ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights