পরিকল্পনাতেই আটকে ছিল স্বাস্থ্য খাত

জয়শ্রী ভাদুড়ী
নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র, রেফারেল সিস্টেম চালু, সরকারি হাসপাতালে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ফার্মেসি নেটওয়ার্ক, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ক্যাটাগরি অনুযায়ী টেস্টের মূল্য নির্ধারণের মতো স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অসংখ্য পরিকল্পনা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। এ ছাড়া স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের ছিল ৩২টি সুপারিশ। কিন্তু এর কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। তাই পরিকল্পনার ফুলঝুড়িতেই অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে দেড় বছর পার করেছে এমনটাই বলছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে যে সুপারিশগুলো করেছিল যেগুলো বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অপারেশন প্ল্যানগুলো (ওপি) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এটা স্বস্তির ব্যাপার। এই একটা কাজ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতের গুণগত পরিবর্তনে আর কিছুই করেনি।’

গত বছরের ৫ মে জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বাধীন ১২ সদস্যের কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সংস্কার প্রতিবেদনে সরকারি হাসপাতালে সেবা বিকাল ৫টা পর্যন্ত করা, বেসরকারি হাসপাতালে সেবামূল্য নির্ধারণ, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়া, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ওষুধের কাঁচামাল তৈরি, স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য সার্ভিস গঠনসহ ৩২টি সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ওষুধ সহজে পাওয়ার লক্ষ্যে সারা দেশে ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল সরকার। প্রাথমিকভাবে সারা দেশে সরকারি ৭০০ হাসপাতালে এ ফার্মেসি চালুর কথা ছিল। দেশের ৪২৯টি উপজেলা হাসপাতাল, ৫৯টি জেলা বা সদর হাসপাতাল, ৩৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২১টির মতো বিশেষায়িত হাসপাতালে এসব ফার্মেসি চালুর পরিকল্পনা ছিল।

আরও পরিকল্পনা ছিল, সরকারের অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ও বড় বড় শহরে ভাড়া বাড়িতে ফার্মেসি চালু করা হবে। এসব ফার্মেসি সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। পাশাপাশি বেসরকারি ফার্মেসিগুলো চলবে আগের মতোই। এতে ওষুধের প্রাপ্যতা আরও বাড়বে। স্বাস্থ্য খাতবিষয়ক সংস্কার কমিটির খসড়া সুপারিশেও দেশব্যাপী ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার কথা এসেছে। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা ও সরকারি হাসপাতালে ওষুধের সরবরাহ বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে কমিটি। স্বাস্থ্য খাতবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সর্বশেষ খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটি করে ফার্মেসি থাকতে হবে। এসব ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ থাকবে। এসব ফার্মেসি চালাবেন প্রশিক্ষিত ডিগ্রিধারী নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টরা। এসব ফার্মাসিস্ট ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে রোগীকে পরামর্শ দেবেন বা কাউন্সেলিং করবেন ও ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করবেন।

যে কোনো প্রয়োজনে যে কোনো সময়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগী বা হাসপাতালের বাইরের মানুষ যেন ওষুধ পান, তার জন্য হাসপাতালের ফার্মেসিগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। সংস্কার কমিশন বলেছে, এসব ফার্মেসি থেকে রোগীকে বিনামূল্যে অত্যাবশ্যকীয় সব ওষুধ দিতে হবে। এসব ফার্মেসি থেকে ওষুধ বিতরণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনুসরণ বা নজরদারি করতে হবে। এর ফলে ওষুধ ব্যবহারের পূর্বাভাস পাওয়া যাবে এবং ওষুধ চুরি বা অপচয় কমিয়ে আনা বা বন্ধ করা যাবে। কিন্তু দারুণ এই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বাইরের ফার্মেসি থেকেই মানুষকে আসল-নকলের দৌরাত্ম্য পেরিয়ে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, জেলা-উপজেলায় হাসপাতাল থাকলেও রাজধানীতে নেই কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র। তাই সাধারণ জ্বর হলেও রোগীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো টারশিয়ারি হাসপাতালে গিয়ে ভিড় করছে। এ সমস্যা সমাধানে নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। একইভাবে রেফারেল সিস্টেম, জেনারেল ফিজিশিয়ান (জিপি), বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়গনস্টিক সেন্টারের ক্যাটাগরি নির্ধারণে নেই কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights