কষ্টের রোজার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার
সেলিম হোসাইন আজাদী
মানুষ যখন ভোগে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তখন ছোট ত্যাগও তার পক্ষে অসম্ভব মনে হয়। একটা সময় ছিল আমরা খাবারে খুব কষ্ট পেয়েছি। বিয়ে, মৃত্যুবার্ষিকী বা মেহমান না এলে ঘরে ঘরে ভালো খাবার রান্না হতো না। এখন আমাদের সময় বদলেছে। খাবার না পাওয়া জাতি আমরা এতটাই গোগ্রাসে গিলতে শুরু করেছি, ধনী-গরিব সবাই এখন ডায়াবেটিক, ফ্যাটি লিভার, হার্টের অসুখে ভুগছেন। আমাদের খাওয়ায় কোনো লাগাম নেই। ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করে আমরা পাগলের মতো খাই। খাওয়ার আগে ওষুধ খাই। খাওয়ার পরও ওষুধ খাই। কিন্তু খাওয়া বন্ধ করি না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এভাবে বেপরোয়া খাওয়াকে বলা হয় ‘কম্পালসিভ ওভার ইটিং’। রোগটি যখন চরমে পৌঁছে তখন তাকে বলা হয় বিং ইটিং ডিজঅর্ডার (বিইডি)। এভাবে বেশি খাওয়ার রোগে ভুগতে থাকা মানুষের জন্য দীর্ঘ সময় খাওয়া থেকে বিরত থাকা আসলেই কষ্টকর। কষ্ট হলেও এটাই তার চিকিৎসা। আল্লাহকে ভয় করে যদি সে কষ্টের রোজা রাখতে পারে তাহলে দুনিয়াতেই সে সুস্থতার নেয়ামত পেয়ে যাবে। শর্ত হলো, সাহরি ইফতারেও পরিমিত খাবার খেতে হবে। আর আখেরাতে রোজাদারের জন্য অপেক্ষা করছে প্রেমময় মাবুদের দিদার। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘সঠিকভাবে সিয়াম পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। একটি হলো ইফতারের মুহূর্ত, অন্যটি প্রেমময় প্রভুর দিদারের মুহূর্ত।’ (মুসলিম, হাদিস ১১৫১।) কীভাবে হবে প্রেমময় প্রভুর দিদার? সবাই কি ভিড়ের মাঝে কষ্ট করে আল্লাহকে দেখবে নাকি আরামে নিজের ঘরে বসে আল্লাহকে দেখবে? এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর পাওয়া যায় হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে। এক দিন জিবরাইল (আ.) হাতে একটি স্বচ্ছ আয়না নিয়ে নবীজির কাছে আসেন। আয়নার মাঝ বরাবর ছিল একটি কালো বিন্দু। জিবরাইল বলেন, হে আল্লাহর দোস্ত! এই কালো বিন্দুটি হলো জুমার দিনের বিশেষ মুহূর্ত। যে সময় জুমা কায়েম হয়- আপনার উম্মতের বিশেষ মর্যাদার একটি কারণ কিন্তু এই জুমার দিন। এই দিনে এমন একটি সময় আছে যখন মুমিন বান্দা যা দোয়া করে আল্লাহ তাই কবুল করেন। হে আল্লাহর দোস্ত! দুনিয়ায় এ দিনটি জুমার দিন হিসেবে পরিচিতি পেলেও আখেরাতে এ দিনটির নাম হবে ইয়াওমুল মাজিদ। নবীজি বললেন? ওগো জিবরাইল, এটা আবার কী বিষয়? জবাবে জিবরাইল ফেরেশতা বলেন, আল্লাহর নবী! কেয়ামতের দিন জান্নাতবাসী যেদিন তার প্রেময় প্রভুর দিদার করবে সে দিনটি হলো জুমার দিন। আপনার প্রভু জান্নাতুল ফেরদাউসে একটি স্বর্ণের পাহাড় বানিয়েছেন। সেখানে একটি মেশকের টিলা আছে। প্রতি জুমার দিন সে টিলায় একটি নূরের প্যান্ডেল বানানো হবে। সে প্যান্ডেলে বসবেন নবীরা। আর ইয়াকুত পাথরের বানানো দৃষ্টিনন্দন মিনারে বসবেন সিদ্দিক, শহীদ ও আউলিয়ারে কেরামগণ। অন্যান্য জান্নাতিরা বসবেন তাদের পেছনে। সবাই মিলে আল্লাহর মহিমা গুণগান করতে থাকবেন।
একপর্যায়ে আল্লাহ বলবেন, ওহে বান্দা! তোমরা আমার কাছে কী চাও? নবী সিদ্দিক শহিদ সবাই বলবেন, হে আল্লাহ! আমরা আপনার সস্তুষ্টি চাই। জবাবে আল্লাহ বলবেন, আমি তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট আছি বলেই তোমরা আজ আমার বাড়ি জান্নাতে আসতে পেরেছো। তবে তোমাদের মন এখনো পুরোপুরি প্রশান্ত না হওয়ার কারণ বুঝতে পেরেছি। তোমরা আমার দিদারের অপেক্ষায় আছো। এ বলে আল্লাহ জান্নাতিতের সামনে নিজ অবয়বে প্রকাশ হবেন। জান্নাতিরা আল্লাহর অবর্ণনীয় অপরূপ সৌন্দর্য দেখে অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকবে। প্রতি জুমার দিনই এভাবে জান্নাতবাসী আল্লাহর দিদারের সৌন্দর্যে ডুবে থাকার সুযোগ পাবে। যে কারণে জান্নাতবাসীর কাছে সব নেয়ামতের চেয়েও বেশি প্রিয় হবে জুমার দিনের ওই বিশেষ মুহূর্তটি। (আত তারগিব ওয়াত তাহরিব, হাদিস ১২৯। ) প্রিয় রোজাদার ভাই! আল্লাহর দিদারের আনন্দ পেতে হলে আজকের এই দিনগুলোতে কষ্ট করে রোজা রাখতে হবে। রোজা রাখা মানে কিন্তু দিনভর না খেয়ে থাকলাম ইফতারে ইচ্ছা মতো খেলাম, সাহরিতে কবজি ডুবিয়ে খেলাম- এমনটা নয়। রোজা হলো মুত্তাকি ও সংযমী হওয়ার চর্চা। কথা কাজে ও খাওয়া সব ব্যাপারে সংযমী হতে পারলেই সত্যিকারের রোজা আদায় হবে। আল্লাহ আমাদের বোঝার তৌফিক দিন।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
পীর সাহেব, আউলিয়ানগর,
www.selimazadi.com
