দুয়ার খুলছে বাণিজ্য আলোচনার
রুকনুজ্জামান অঞ্জন
► বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আজ বৈঠক ভারতীয় হাইকমিশনারের
► ৪ বছর ধরে হয় না সচিব পর্যায়ের বৈঠক
► সাড়ে ৩ বছর বন্ধ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনা
► ২ বছর সেপা চুক্তি নিয়ে আলোচনা স্থগিত
► অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যক্রম বন্ধ বর্ডার হাটের
বাণিজ্য ইস্যু নিয়ে চার বছর ধরে বৈঠক হয় না বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের। সাড়ে তিন বছর ধরে বাণিজ্য-সম্পর্কিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হচ্ছে না। দুই দেশের মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) চুক্তি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রয়েছে দুই বছর ধরে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে বর্ডার হাটের কার্যক্রম। স্থলবন্দর দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রপ্তানি। এমনকি ভারতের বন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রানশিপমেন্ট সুবিধাও বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের দুয়ার যখন এভাবেই বন্ধ-তখন সেই বন্ধ দরজা খোলার লক্ষ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে আজ সকালে সচিবালয়ে বৈঠক করতে যাচ্ছেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণব কুমার ভার্মা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২২ সালের ৪ মার্চ। ওই সভাটি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় রীতি অনুযায়ী পরের সভাটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্বসহ নানা ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত চার বছরেও সেই সভা করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ট্রেডের (জেডাব্লিউজিটি) বৈঠকটিও অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। এরপর বিভিন্ন সময় সচিব ও জেডাব্লিউজিটি বৈঠক অনুষ্ঠানের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও ভারতের দিক থেকে সাড়া মেলেনি। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসার পর এবার ভারত নিজের আগ্রহেই এগিয়ে আসছে। এরই রেশ ধরে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আজ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের দরজাটি মূলত বন্ধ হতে থাকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই। অভ্যুত্থানের পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া নিয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছে। এর প্রভাব পড়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৮ এপ্রিল ভারতের বন্দর ব্যবহার করে অন্য দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে ভারত। একই বছরের ১৫ এপ্রিল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে সুতা আমদানি সুবিধা বাতিল করে এনবিআর। হিলি ও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৫ এপ্রিল এই অনুমতির মেয়াদ শেষ হলে তা-ও আর বাড়ায়নি সরকার। ওই বছরের ১৭ মে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত। অধিকন্তু একই বছরের ২৭ জুন স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাতপণ্য, সুতা, ইয়ার্নসহ ৯ ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল অব ফরেইন ট্রেড (ডিজিএফটি)। এমনকি সীমান্ত বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে যে ৭টি বর্ডার হাট ছিল, সেগুলোর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য, যা এখনো সচল হয়নি। দুই দেশের এই বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ে দেশের রপ্তানি খাতে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কমেছে রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষ তিন পণ্য-তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট সেপা চুক্তি নিয়ে যে আলোচনা চলছিল ২০২৪ সালের পর সেই আলোচনাও স্থগিত হয়ে যায়। ভারত থেকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ নিত্যপণ্য আমদানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল, ২০২৪ সালের পর স্থগিত হয়ে যায় সে আলোচনাও। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এত সব আলোচনার জট খুলতেই বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও সুইস ফাউন্ডেশন ফর টেকনিক্যাল কো-অপারেশনের সিনিয়র অ্যাডভাইজার মনোজ কুমার রায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে যে বিধিনিষেধ জারি হয়েছে তাতে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ-ভারত একে অপরের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। রাজনৈতিক কারণে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক যে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়-সম্ভবত, দুটি দেশই তা অনুধাবন করে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আবার কাজ শুরু করতে চাইছে। এটি ভালো উদ্যোগ। উন্নয়ন এবং উৎপাদনের স্বার্থেই দুই দেশের একে অপরকে দরকার। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব পাল্টাপাল্টি বিধিনিষেধ জারি হয়েছে সেগুলো দূর করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ।
