স্মরণকালের বৃহৎ অভিযান

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

অনেকটা হলিউড মুভির মতো রুদ্ধশ্বাস অভিযান। পথে পথে সন্ত্রাসীদের প্রতিবন্ধকতা, রাস্তার কালভার্ট ভেঙে রাখা, পথে বড় ট্রাক রেখে বাধাদান; ইত্যাদি নানান ঘটনা ঘটেছে গতকাল সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর অভিযানে। ভোর থেকে যৌথ বাহিনীর ৩ সহ¯্রাধিক সদস্য এ অভিযানে অংশ নেন। চলে টানা ১১ ঘণ্টা। অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত ১৫ সন্ত্রাসীকে। উদ্ধার করা হয় বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসহ আগ্নেয়াস্ত্র।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নাজমুল হাসান বলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৩ হাজারের অধিক সদস্য নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান চালানো হয়। ১১ ঘণ্টার এ অভিযানে বিভিন্ন সংস্থা সন্ত্রাসী সন্দেহে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। পরে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য জানানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘অভিযানে পথে পথে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। ঢোকার পথে একটি রাস্তায় ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেয় সন্ত্রাসীরা। একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন।’ তিনি জানান, জঙ্গল সলিমপুর যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সিএনজিচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের সোর্স রয়েছে। তাদের মাধ্যমে খবর জেনে আগে থেকেই সন্ত্রাসীরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখে।

অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৬টায় সলিমপুরে যৌথ অভিযান শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৩ হাজারের অধিক সদস্য। অভিযানের অংশ হিসেবে জঙ্গল সলিমপুরের চারদিক ঘিরে ফেলা হয়। প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অংশ নেন অভিযানে। এ অভিযানে পদে পদে পড়তে হয় প্রতিবন্ধকতার মুখে। যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে মূল রাস্তাতেই রাখা হয় একটি ট্রাক। কালভার্টটিও ভেঙে দেওয়া হয়। তুলে ফেলা হয় নালার স্ল্যাপ। পরে কালভার্টের ওই অংশ ইট-বালি দিয়ে ভরাট করে যৌথ বাহিনী। এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করেন যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। ১১ ঘণ্টার টানা অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত ১৫ সন্ত্রাসীকে। উদ্ধার করা হয় ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র। যৌথ অভিযানে অংশ নেন সেনাবাহিনীর ৫৫০, পুলিশের ১ হাজার ৮০০, এপিবিএনের ৩৩০, র‌্যাবের ৪০০ ও বিজিবির ১২০ সদস্য। এ ছাড়া ১৫ এপিসি, তিনটি ডগ স্কোয়াড অংশ নিয়েছে অভিযানে। প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের ‘অপরাধের দুর্ভেদ্য সা¤্রাজ্য’ খ্যাত জঙ্গল সলিমপুর। মহানগরের বায়েজীদ বোস্তামী থেকে ২ কিলোমিটার পশ্চিম এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির লাগোয়া সীতাকুন্ড উপজেলার দুর্গম এলাকায় এর অবস্থান। ৩ হাজার ১০০ একর এলাকার জায়গাটি চট্টগ্রামের অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে ছোটবড় মিলে কমপক্ষে ২০টি সন্ত্রাসী বাহিনী। যার মধ্যে রয়েছে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, লাল বাদশা, ফারুক, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক বাহিনী। এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর নতুন করে বাহিনী গড়ে তোলেন রোকন উদ্দিন। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হন কাজী মশিউর, গাজী সাদেক ও গোলাম গফুর। অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র পাহারা থাকে। প্রতিটি বাসিন্দাকে অপরাধী চক্রের দেওয়া বিশেষ ‘পরিচয়পত্র’ বহন করতে হয়, যা ওই এলাকায় প্রবেশের পাস হিসেবে গণ্য করা হয়। গত ১৭ মাসে এদের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত সাতজন। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন কয়েক শ। সর্বশেষ সন্ত্রাসীদের হামলায় র‌্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভুইয়া নিহত এবং তিন সদস্য আহত হন।

প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে : দীর্ঘদিন পর জঙ্গল সলিমপুরের দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় এখন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে-এমন দাবি করেছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। গতকাল দুপুরে সলিমপুরে অভিযান পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন। ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ এলাকার উন্নয়নের জন্য সরকার যে পরিকল্পনাগুলো গ্রহণ করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত সহযোগিতায় সেই বাধা দূর হয়েছে। এখন থেকে সরকার আগে গ্রহণ করা পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারবে এবং এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights