তাবুতে ঈদ, বাজারে আগুন, ইরান-গাজা-লেবাননে কী ভয়াবহ চিত্র

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ধোঁয়া আর বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। এমন বাস্তবতায় ইরান, গাজা, লেবাননে এবার ঈদুল ফিতরের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সংকট, সহিংসতা আর অনিশ্চয়তা মিলিয়ে উৎসবের চিরচেনা রূপ যেন হারিয়ে গেছে।

বৈরুতের ডাউনটাউন ওয়াটারফ্রন্ট এলাকায় আশ্রয়ের খোঁজে দিন কাটাচ্ছেন আলাআ। সিরীয় এই শরণার্থী, অধিকৃত গোলান মালভূমির বাসিন্দা, এখন পুরোপুরি গৃহহীন। তিনি জানান, সারা দিন ঘুরেও কোথাও স্থায়ী আশ্রয় পাননি। আগে দাহিয়েহ এলাকায় থাকতেন, যা ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে।

লেবাননজুড়ে এসব হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আলাআ এখন কেবল একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজছেন। ঈদ নিয়ে তার কোনো পরিকল্পনা নেই। একটি তাবু জোগাড় করাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। তিনি বলেন, একটি স্কুলে থাকার চেষ্টা করেছিলেন, পরে কর্নিশ এলাকায় রাত কাটানোর চেষ্টা করেন, শেষ পর্যন্ত পৌরসভার পরামর্শে ওয়াটারফ্রন্টে আসেন।

তাবু না পেয়ে আপাতত খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হচ্ছে তাকে। আশপাশের অনেকেই তাবু পেলেও তিনি পাননি। ফলে দামী রেস্তোরাঁ ও বারের জন্য পরিচিত এলাকা এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের তাবুর শহরে পরিণত হয়েছে। লেবাননে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত।

দেশটির মানুষ এখনো অনিশ্চয়তায় আছে, এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। ফলে ঈদের মতো উৎসবও হয়ে উঠেছে ভারী ও অনাড়ম্বর।

ইরানে যুদ্ধের পাশাপাশি আগে থেকেই থাকা অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের হামলার তৃতীয় সপ্তাহে থাকা দেশটিতে মানুষ প্রয়োজনীয় কেনাকাটাই করতে পারছে না। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারও বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঈদের ধর্মীয় দিকটিও কিছু মানুষের কাছে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সরকারবিরোধী অনেকেই ধর্মীয় আচারকে রাজনৈতিক সমর্থনের সঙ্গে দেখছেন। এ বছর নওরোজ একই দিনে পড়ায় অনেকে ঈদ এড়িয়ে কেবল নওরোজ উদযাপনে মন দিচ্ছেন।

গাজায় পরিস্থিতি আরও করুণ। ইসরায়েলি হামলার মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঈদের প্রস্তুতি নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খেলনা থেকে খাবার সবকিছুর দাম বেড়েছে।

গাজা সিটির বাসিন্দা খালেদ দিব, বয়স ৬২, একটি আংশিক বিধ্বস্ত বাড়িতে থাকেন। ঈদের আগে বাজারে গিয়ে তিনি দেখেছেন ফলমূল, সবজির দাম তার নাগালের বাইরে। তিনি বলেন, বাইরে থেকে ঈদের পরিবেশ স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

তিনি জানান, আগে ঈদে পরিবারকে উপহার দিতেন, ঘর সাজাতেন, বাচ্চাদের নতুন কাপড় কিনে দিতেন। এবার যুদ্ধবিরতি হলেও কিছুই সম্ভব নয়।

তিন সন্তানের জননী শিরীন বলেন, দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর তারা এমন অবস্থায় আছেন যেখানে মৌলিক চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। তিনি এখন প্লাস্টিক ও কাঠ দিয়ে তৈরি একটি জরাজীর্ণ বাসস্থানে দিন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে বৈরুতের রাজনৈতিক গবেষক, সংগঠক করিম সাফিয়েদিন কিছুটা আশাবাদী। তিনি জানান, যুদ্ধের মধ্যেও পরিবারকে নিয়ে ঈদ পালন করবেন। তার মতে, এই সামাজিক বন্ধন ও সংহতিই কঠিন সময় পার হওয়ার শক্তি জোগায়।

সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights