তেলের জন্য হাহাকার

জিন্নাতুন নূর

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার চলছে। ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পেট্রোলপাম্পগুলোতে তেলের ওপর রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও ঈদের ছুটিতে ঢাকার মোটরসাইকেলচালক, প্রাইভেটকার ও অন্য যানবাহনের মালিক-চালকদের তেল পেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর পাম্পগুলোতেও ছিল চরম ভোগান্তি। তেল পেতে চালকরা এক পেট্রোলপাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটে যান। কিন্তু তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। পাম্প মালিকরা জানান, ডিপো থেকে তাদের চাহিদার অর্ধেকেরও কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আবারও ভোক্তাদের তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে তেলের সংকট নেই বলা হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তেল সংকটের কারণে এরই মধ্যে গাড়িচালকদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংকট অব্যাহত থাকলে পরিবহন খরচ ও বোরো মৌসুমে ফসল উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির শঙ্কা ক্রমেই তৈরি হচ্ছে। আর জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে সরকারের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার মিল খুঁজে না পাওয়ায় মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা আছে।

মূলত ঈদের দিন রাত থেকেই ঢাকার পাম্পগুলোতে তেল সংকট দেখা দেয়। সরবরাহ সংকটের কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দিন-রাত গাড়ির দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা। বিশেষ করে তেল নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে পাম্পের কর্মীদের প্রায়ই কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির মতো ঘটনা ঘটছে। পাম্প মালিকরা জানান, তারা চাহিদার অর্ধেক তেলও ডিপো থেকে পাচ্ছেন না। আবার সংকট বাড়তে পারে এই আশঙ্কা থেকে অনেকে অতিরিক্ত তেল কিনছেন। এতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর বেশ কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে তেলের জন্য মানুষের হাহাকার চোখে পড়ে। মিরপুরের বেগম রোকেয়া স্মরণীর মেসার্স সোবহান ফিলিং স্টেশনের বাইরে গতকাল দুপুরে তেল নেওয়া জন্য গাড়ির দীর্ঘ লাইন ছিল। চাকরিজীবী আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি তেলের জন্য। এর আগে মিরপুরের আরও ৫টি পেট্রোল পাম্পে গিয়েছি কিন্তু কোথাও অকটেন পাইনি।’ এই পাম্পের এক কর্মকর্তা বলেন, আমার এখানে প্রতিদিন ৯ হাজার লিটারের বেশি অকটেন প্রয়োজন কিন্তু এখন দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার লিটার।

গতকাল দুপুরে বিজয় স্মরণীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের তেল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেট কারের লাইন সিভিল এভিয়েশন স্কুল পর্যন্ত চলে যায়। আর মোটরসাইকেলের লাইন চলে যায় জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত। মোটরসাইকেলে অকটেন নিতে বেসরকারি কর্মকর্তা সুজন হায়দায় সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সুজন বলেন, এর আগে বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে তেল পাইনি। এই ফিলিং স্টেশনের সুপারভাইজার নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমার এখানে দৈনিক ৫টি তেলবাহী গাড়ির চাহিদা। কিন্তু এখন পাচ্ছি ৩টা গাড়ি।

ঢাকার বাইরে উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও গাইবান্ধাতেও ঈদের ছুটিতে তেলের জন্য মানুষের হাহাকার চোখে পড়ে। গাইবান্ধার সাতটি উপজেলার ১৭টি ফিলিং স্টেশন তেল সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। গত সোমবার দিনভর বন্ধ থাকার পর শহরের আর রহমান ফিলিং স্টেশন খুলতেই সেখানে গাড়ির দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। আবার বগুড়ায় তেল সংকটের ভয়ে অতিরিক্ত তেল কেনায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আর তেলের অভাবে খুলনার অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল সচিবালয়ে বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পাম্পগুলোতে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে শুরু করায় পাম্পগুলোতে সময়ের আগেই তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ নিজস্ব উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়, অধিকাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবও বাজারে পড়ে। তাই আমাদের সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে।

বাইরের উৎস থেকে তেল ক্রয়ের চেষ্টা : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, আমরা বাইরের কয়েকটি উৎস থেকে জ্বালানি তেল ক্রয়ের জন্য প্রস্তাব পাচ্ছি। এর মধ্যে যাচাইবাছাই করে আমাদের জন্য যেটি যথাযথ হবে আমরা সেটিই নেব। এ ছাড়া ভারত সরকারকেও জ্বালানি সরবরাহের জন্য বলেছি। তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights