তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়াল

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান-কে ঘিরে চলমান সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়।

সোমবার সকালে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে এই অবস্থানে পৌঁছায়। এর আগে ১৯ মার্চ সাময়িকভাবে দাম ১১৯ ডলার ছুঁয়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই উত্থানের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংঘাতের উত্তাপ আরও বেড়ে যায়, যখন ইরান সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রস্তুতির ঘোষণা দেয়। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মার্কিন সেনারা প্রবেশ করলে তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান জোরদার করে ইসরায়েল।

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত করে দিলে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যাহত হয়। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব এশিয়ার শেয়ার বাজারেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক-উভয় সূচকেই ৪ শতাংশের বেশি পতন দেখা যায়, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রতিফলন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক দেশকে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ না ছাড়লে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। যদিও তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধের অবসানে ১৫ দফা প্রস্তাবও দিয়েছেন এবং পাকিস্তান-এর মধ্যস্থতায় আলোচনা এগোতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

তবে তেহরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা শর্ত দিয়েছে-ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং প্রণালির ওপর নিজেদের অধিকার স্বীকৃতি দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল দ্রুত পুনরুদ্ধার না হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং তা ১২০ ডলার অতিক্রম করার আশঙ্কাও রয়েছে। জ্বালানি বাজারে বর্তমান সরবরাহ সংকটকে তারা ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

তবে উত্তেজনার মাঝেও সীমিত আকারে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ইরান ধীরে ধীরে তাদের কিছু মিত্র দেশের জাহাজকে প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দিচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, তাদের ২০টি পতাকাবাহী জাহাজকে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত সপ্তাহে বলেছেন যে, ইরান মালয়েশীয় জাহাজগুলোকে প্রণালিটি অতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সাতটি অ-ইরানি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যা বুধবারের পাঁচটি এবং মঙ্গলবারের চারটি জাহাজের চেয়ে বেশি।

তবে যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এখনো সময় লাগবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র : আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights