রোহিঙ্গাদের সহায়তা আরও তলানিতে

আবির আব্দুল্লাহ

দিনদিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে রোহিঙ্গাদের জন্য দাতা দেশগুলোর সহায়তা। ২০১৭ সালের বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০০ মিলিয়নে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দাতা দেশগুলোর সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনযাত্রার জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ কমছে। ফলে বাধ্য হয়েই রোহিঙ্গাদের খাদ্যসহায়তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। আজ থেকে এ নীতিমালা চালু হচ্ছে। নতুন নিয়মে রোহিঙ্গাদের তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সহায়তা কার্যক্রম পরিচলনা করা হবে। এর ফলে অবস্থানভেদে কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত প্রতিটি পরিবারের পাবলিক রেশনেও পরিবর্তন আসবে। এ নতুন ব্যবস্থাকে অবিচার হিসেবে দেখছেন রোহিঙ্গা নেতারা। এদিকে খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

জানা যায়, আগে জনপ্রতি মাসে ১২ ডলারের সমপরিমাণ খাদ্যসহায়তা দেওয়া হলেও নতুন ব্যবস্থায় ৭ ডলার, ১০ ডলার ও ১২ ডলার-এ তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সহায়তা দেবে ডব্লিউএফপি। পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা ও সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে প্রতিটি পরিবারের রেশন। তিন ক্যাটাগরির প্রথম অবস্থানে থাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে প্রতি মাসে মাথাপিছু ৭ ডলার করে দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপের প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ পাবে ১২ ডলার করে; এর মধ্যে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, শিশু-নেতৃত্বাধীন পরিবার বা বয়স্ক সদস্য থাকা পরিবারগুলো অতিরিক্ত ৩ ডলার সহায়তা পাবে। তৃতীয় ধাপে বাকি ৫০ শতাংশ মানুষকে দেওয়া হবে মাথাপিছু ১০ ডলার করে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে বড় রোহিঙ্গা ঢল এলেও এর সূত্রপাত মূলত ২০১২ সালেই। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের কাছাকাছি। তবে অনিবন্ধিত আরও রোহিঙ্গা রয়েছে, যাদের সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। বড় রোহিঙ্গা ঢলের পর আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা গোষ্ঠীর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের জন্য বড় আকারের ত্রাণকার্যক্রম চালু ছিল।

জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া যেত বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু কয়েক বছরে এ সহায়তায় ভাটা পড়েছে। ২০২৪ সালের পর থেকে তা আরও কমে গেছে এবং ২০২৫ সালে প্রাপ্ত সহায়তা অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। গত বছরে প্রাপ্ত সহায়তার পরিমাণ ছিল ৪০০ মিলিয়ন ডলার। চলতি বছরে ১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও কত অর্থায়ন পাওয়া যাবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। খাদ্যসহায়তা কমে গেলে রোহিঙ্গাদের খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং পুষ্টিহীনতা বাড়বে। এর ফলে অনেকেই জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে চলে যেতে পারে বা সীমান্তবর্তী অপরাধে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এরই মধ্যে ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখা দিয়েছে। চুরি, ডাকাতিসহ নানান অপরাধ বেড়েছে। ভাসানচরেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া অর্থের অভাবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।’

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘রোহিঙ্গারাও মানুষ এবং তাদের প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের প্রয়োজন। তবে ডব্লিউএফপি নতুনভাবে ১২, ১০ ও ৭ ডলারের তিনটি ক্যাটাগরিতে খাদ্যসহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিচার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। খাদ্যসহায়তায় ঘাটতি দেখা দিলে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জীবিকার তাগিদে স্থানীয় গ্রামগুলোতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights