ইউনূস ক্ষতেও স্বস্তির অর্থনীতির ভাবনায় সরকার

মোস্তফা কামাল
একেকটি ঘটনায় অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক প্রায় সবখানেই নানা ঘাপলা ধরা পড়ছে। ঘটনা না ঘটলে বা ফাঁস না হলে তা এত স্পষ্ট না-ও হতে পারত। নতুন বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে অর্থনীতির দৈন্যদশায় অনেকটাই পথহারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। টেনে আনতে ছিঁড়ে যায় অবস্থা।

টিকা না পেয়ে অনেক শিশুর অপমৃত্যু ও হামের হঠাৎ হানার হেতু খুঁজতে গিয়ে ধরা পড়ছে স্বাস্থ্য খাতের অবিশ্বাস্য পিলে চমকানো ফোকলা চিত্র। শিক্ষা খাত জোড়াতালিতেও কুলাচ্ছে না।

এত চাপের মধ্যে ক্ষমতায় আসার মাস চারেকের মধ্যে নতুন অর্থবছর কড়া নাড়ছে। প্রণয়ন করতে হচ্ছে জাতীয় বাজেট।

বৈশ্বিক কারণে জ্বালানি খাতে চাপ আরো বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই চড়া। রাজস্ব আদায়ে কেবলই ঘাটতি। রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।

পূর্ববর্তী ঋণের চাপের সঙ্গে বর্তমান জ্বালানি সংকট যোগ হয়ে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। অর্থনীতির রক্ত চলাচল ঠিক রাখাই এখন কঠিন। এর মধ্যেও সরকারের আশা ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির সূচনা করা। সরকার গঠনের পর থেকেই বলা হচ্ছিল, আর টাকা ছাপিয়ে নয়, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেই তহবিলের সংস্থান হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে ট্যাক্স-জিডিপি বাড়ানোর ভাবনা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।

কিন্তু বিপরীত তথ্য হচ্ছে, অর্থনৈতিক ধাক্কা এরই মধ্যে বাংলাদেশের বাজার, শিল্প, এমনকি রান্নাঘরেও পৌঁছে গেছে।

জ্বালানি আমদানি, উপসাগরীয় শ্রমবাজার ও বৈশ্বিক শিপিং রুটের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও চাপে ফেলেছে। মানুষের মাঝে আতঙ্ক। ব্যবসায়ীদের নতুন করে দুর্ভাবনায় ফেলেছে জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা, খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি। নতুন সরকারের জন্য এটি কোনো দূরের ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রথম বড় পরীক্ষা। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি দূরের যুদ্ধও কাছের বাজারে পণ্যের দাম ঠিক করে দেয়। আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল্যকাঠামো নির্ধারণের একটি মৌলিক উপাদান। এমনিতেই গেল দুটি সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষি খাত নাকানি-চুবানিতে। নতুন সরকার আমলে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতির মাঝে চেপেছে বৈশ্বিক তাপ। সিমেন্ট, ইস্পাত ও সিরামিকের মতো জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলো অনেক দিন থেকেই চাপে। ছোট ও মাঝারি বেশ কিছু শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু টিকে আছে উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে।

পরিবহন খাতে ডিজেলের দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাবে, যা পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রভাব পড়বে। মানে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এই চাপ বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই। এনবিআর, বিডা, বিএসইসি, ডিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে অর্থ ও পুঁজিবাজারসহ অর্থ খাতে ইতিবাচক ভূমিকায় নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরির একটি বাতাবরণ দেখা দেয়। কিন্তু একেকটি ধাক্কা ও ঘটনা এসে তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বাস্তবতার মাঝেই আসছে নতুন বাজেট। আর বাজেটের আগে এক এক করে সামনে আসছে নানা দুর্বলতার খবর। ফাঁস হচ্ছে বিভিন্ন খাতে ফোকলা হয়ে যাওয়ার তথ্য। ঘটনাচক্রে তা বেশি দৃশ্যমান স্বাস্থ্য খাতে। হামে প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে। অথচ বছর কয়েক আগেও বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি-ইপিআই সাফল্য ছিল বিশ্বের রোল মডেল। সাম্প্রতিক তথ্য ভয়াবহ। ২০২২ সালে টিকার আওতা ছিল ৯৭.৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত তা ৮৫.৮ শতাংশ। আর ২০২৫ সালে তা ঠেকে মাত্র ৫৭.১ শতাংশে। টিকার নজিরবিহীন এ অব্যবস্থাপনার ফলে দেশে কখন যে হাম হানা দিয়ে এরই মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে, তা বোঝারও সুযোগ হয়নি!

স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের হঠাৎ করে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ করে দেওয়া ছিল অন্যতম একটি খামখেয়ালিপনা। ১৯৭৯ সাল থেকে ওপির মাধ্যমে টিকা কিনে ইপিআইকে সরবরাহ করা হতো। এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, চিঠি চালাচালি এবং বাজেটের দীর্ঘসূত্রতায় সময়মতো টিকা দেশে পৌঁছেনি। এর ফলে শুধু হাম নয়, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, এইডস নিয়ন্ত্রণ, এমনকি দেশ থেকে নির্মূল হতে চলা কালাজ্বর ও ফাইলেরিয়ার মতো রোগও আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইউএসআইডির ফান্ড বন্ধ হওয়া এই সংকটকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। সরকারকে ওই সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছে বদলির হিড়িক, ইন্টার্ন ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে। আর স্বাস্থ্য খাত হয়ে পড়ে অভিভাবকহীন। এর জেরে এখন হামে নাকাল দেশ। ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক অবস্থা। ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সাত-আট জেলায় মহামারি পর্যায়ে। দৈনিক কালের কণ্ঠে এ বিষয়ক স্কুপ সংবাদ না এলে হয়তো এখন তা অন্তরালেই থেকে যেত। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগ’ বলছেন। এ থেকে উত্তরণে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েও কুলাতে পারছে না সরকার। এর জের বা ছাপ গিয়ে পড়েছে শিক্ষা সেক্টরে। ভাবতে হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে। তা ভাবতে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, পাঠদানসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় যোগ হয়ে গেছে, যা ছিল এ সময়ের ধারণারও বাইরে।

করোনার সময় জাতিসংঘ বলেছিল, বন্ধের ক্ষেত্রে সবার শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর খোলার ক্ষেত্রে সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো সর্বাধিক আক্রান্ত হয়েও সেটাই করেছিল, আর আমরা তুলনামূলকভাবে কম আক্রান্ত হয়েও উল্টোটা করেছিলাম। একটানা ৫৪৪ দিন স্কুল-কলেজ বন্ধ রেখে রেকর্ড গড়েছিল বাংলাদেশ। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষা খাতে রূপান্তরিত বাংলাদেশ দেখার প্রত্যাশা দেখিয়েছিল সরকার। প্রধানমন্ত্রী হয়ে ক্ষমতায় বসার আগেই তারেক রহমান তাঁর ১০ মিনিটের শিক্ষা ভাবনায় কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছিলেন। ক্ষমতায় অভিষেকের পরই শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনে হাত দেন। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সৃজন-মননচর্চা, পাঠ, গবেষণা, প্রকাশনা, সংস্কৃতিচর্চা ও বহু ভাষা শিক্ষা নিয়ে আলোচনাও বেশ জমেছিল। সেখানে এখন শিক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থী সুরক্ষা হয়ে গেছে বেশি প্রাসঙ্গিক ও আবশ্যক।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights