বিমান বিধ্বস্ত হলে পাইলটকে শত্রুর ডেরা থেকে কীভাবে উদ্ধার করে মার্কিন বাহিনী?

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে দেশটির পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণ পদ্ধতি। মার্কিন বিমানবাহিনীর কোনো সদস্য যখন শত্রুশিবিরে বা বৈরী পরিবেশে আটকা পড়েন, তখন তাকে উদ্ধারে শুরু হয় এক অত্যন্ত জটিল ও সমন্বিত সামরিক অভিযান। এই পুরো প্রক্রিয়ার ভিত্তি হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ‘পার্সোনেল রিকভারি জয়েন্ট পাবলিকেশন’ (পিআরজেপি)। এই নীতিমালায় দুটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; প্রথমত আকাশযোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত স্পর্শকাতর প্রযুক্তি ও সিস্টেম যাতে শত্রুর হাতে না যায় তা দেখা।

মার্কিন সামরিক নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের প্রতিটি সদস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অমূল্য সম্পদ। এছাড়া অতীতে দেখা গেছে, বন্দি সেনাদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অপপ্রচার চালানো বা দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শত্রু দেশগুলো। এই ঝুঁকি এড়াতেই যখনই কোনো বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বা ভূপাতিত হয়, সঙ্গে সঙ্গেই পূর্বপরিকল্পিত উদ্ধারকারী দলগুলোকে মোতায়েন করা হয়। এই উদ্ধার অভিযানে বিশেষায়িত বাহিনী, ড্রোনের নজরদারি এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির এক সঙ্গে কাজ করে।

পাইলট যখন প্যারাসুটে করে শত্রু এলাকায় অবতরণ করেন, তখন তার প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য থাকে নিজের অস্তিত্ব গোপন রাখা। শত্রুর চোখ এড়িয়ে লুকিয়ে থাকা এবং বন্ধুভাবাপন্ন বাহিনীর সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ স্থাপন করাই তখন তাদের মূল কাজ। এই পুরো সময়টিতে তারা নিজেদের প্রশিক্ষণ দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শত্রুর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করেন। প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে পানি খুঁজে বের করতে হয় কিংবা প্রাকৃতিক আড়ালে গা ঢাকা দিতে হয়, সেসব কৌশল তাদের পেশাদার জীবনের শুরুতেই শিখিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে মার্কিন কমান্ডোরা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কাজ করেন। অনেক সময় এয়ার ফোর্সের প্যারা রেসকিউ জাম্পার, নেভি সিল বা সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল এই মিশনে অংশ নেয়। তাদের নিরাপত্তায় আকাশে চক্কর দেয় সশস্ত্র হেলিকপ্টার বা শক্তিশালী যুদ্ধবিমান। আধুনিক ড্রোনের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে পাইলটের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে উদ্ধারকারী দল সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারে। এই ধরনের অভিযানে প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হয়।

শুধু জনবল রক্ষা করাই নয়, বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ রক্ষা করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিমানের রাডার সিস্টেম, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং গোপন অস্ত্রশস্ত্র যদি শত্রুর হাতে পড়ে, তবে তা বিশাল গোয়েন্দা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। যদি স্থলপথে ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তবে মার্কিন বাহিনী আকাশ থেকে বোমা ফেলে সেই প্রযুক্তি ধ্বংস করে দেয়। শত্রুপক্ষ যাতে কোনোভাবেই উন্নত মার্কিন প্রযুক্তির ফরেনসিক বিশ্লেষণ করতে না পারে, সেজন্যই এই কঠোর ব্যবস্থা।

পাইলটদের প্রশিক্ষণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড এস্কেপ’ (SERE) ট্রেনিং। এই কঠিন অনুশীলনের মাধ্যমে শেখানো হয় কীভাবে শত্রু এলাকায় টিকে থাকতে হবে এবং যদি দুর্ভাগ্যবশত কেউ বন্দি হন, তবে চরম চাপের মুখেও কীভাবে নিজের মনোবল ধরে রাখতে হবে। শত্রুর জেরার মুখে কোনো গোপন তথ্য ফাঁস না করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করার এই বিদ্যা একজন পাইলটের জন্য জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন কিছু সফল উদ্ধার অভিযানের উদাহরণ রয়েছে। ২০১২ সালে আফগানিস্তানে তালেবান নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি মার্কিন হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাইলটদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে ইরানের আকাশে উদ্ভূত পরিস্থিতিতেও মার্কিন বিশেষজ্ঞরা অন্ধকারের ওপর ভরসা রাখছেন। তারা মনে করেন, মার্কিন বাহিনীর কাছে থাকা উন্নত নাইট ভিশন প্রযুক্তি এবং ইনফ্রারেড যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্ধকারে পাইলটদের বাড়তি সুবিধা দেয়, যা শত্রুর জন্য মোকাবিলা করা কঠিন।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights