এপ্রিলজুড়ে ভোগাবে তাপপ্রবাহ
শামীম আহমেদ
উষ্ণতম মাস এপ্রিলের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। চলতি মাসজুড়ে তিন থেকে ছয়টি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
গতকাল ৪ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায় ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন দেশের ১৫টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এর আগের দিন ২৭টি জেলায় তাপপ্রবাহ দেখা যায়, যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অস্বস্তিকর।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যার পর খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। এতে সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কিছুটা কমে স্বস্তি মিলতে পারে। পরবর্তী তিন দিনও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ৯ এপ্রিলের পর বৃষ্টির প্রবণতা কমে গিয়ে আবারও তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের গড় স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অঞ্চলভেদে এ তাপমাত্রা কিছুটা কমবেশি হয়। যেমন চুয়াডাঙ্গায় গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি, ঢাকায় ৩৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি এবং সিলেটে ৩০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে মাসের শুরুতেই অধিকাংশ এলাকায় তাপমাত্রা এই স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করেছে। তাপপ্রবাহের মাত্রা নির্ধারণে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মৃদু, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গতকাল চুয়াডাঙ্গার পর যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা, পটুয়াখালীসহ খুলনা বিভাগের সব জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফেনী ও সিলেটে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও দেশের বেশির ভাগ এলাকা ছিল শুষ্ক।
এর আগের দিন চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে দুই থেকে চারটি মৃদু বা মাঝারি এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা থেকে মাঝারি বজ্রঝড় এবং ১ থেকে ৩ দিন তীব্র কালবৈশাখির সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ঝড়বৃষ্টির সময় তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমলেও পরে আবার তা বাড়তে পারে।
জুন পর্যন্ত পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ সময়ে তিন থেকে চারটি তীব্র এবং ছয় থেকে আটটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ হতে পারে। আবহাওয়াবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের ধরন বদলে যাচ্ছে এবং তা বর্ষাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে, ফলে গরমের তীব্রতা আগের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকলেও গরমের অনুভূতি বেশি থাকবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, ঢাকা, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে তাপপ্রবাহের প্রভাব বেশি পড়তে পারে। উল্লেখ্য ২০২৪ সালে দেশে টানা ৩৬ দিনের দীর্ঘ তাপপ্রবাহ রেকর্ড হয়েছিল, যা গত ৭৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে চলতি বছরে তত দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। মাঝেমধ্যে বজ্রঝড়ের কারণে স্বস্তি এলেও পরে আবার তাপপ্রবাহ ফিরে আসতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা ডব্লিউএমওর ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট-২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫-এই সময়কাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। ২০২৫ সাল ছিল গত ১৭৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর, যা প্রাকশিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ও ঘন ঘন হতে পারে।
