স্বস্তিতেই হাটাচলা, তবুও কেন বাধা?

আশিক উল বারাত
রাজধানীর গুলিস্তানের সড়ক ও ফুটপাতে নেই আগের সেই চিরচেনা ঘিঞ্জি অবস্থা! নেই হাজার রকমের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকা অবৈধ স্থাপনার সেই হাঁকডাক। সড়কের যে জায়গায় পা ফেলাই ছিল কষ্টকর, সেখানে এখন মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। আগে সড়কের যে পয়েন্টগুলোতে দীর্ঘ সময় যানজট লেগে থাকত, একই স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন স্থবির হয়ে থাকত। এখন সে পয়েন্টগুলো ফাঁকা। যানজটের এ পয়েন্টগুলো সহজেই পার হতে পেরে খুশি চালকরা।

ফুটপাত ফাঁকা হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করছেন পথচারীরাও। এমন চিত্র শুধু গুলিস্তানের রাস্তায় নয়, মিরপুর ১০ থেকে ১৪ নম্বর, বনানী, বাড্ডা, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, গুলশানসহ পুরো রাজধানীতে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত অভিযানে দেখা যাচ্ছে।

ফুটপাত দখলমুক্ত অভিযানের ফলাফল

ঢাকা মহানগর পুলিশের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। কোথাও রেস্টুরেন্টের রান্নার সরঞ্জাম, কোথাও ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি, আবার কোথাও দোকানের বর্ধিত অংশ ফুটপাতজুড়ে রাখা হয়েছিল। এসব অপসারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। ফলে পথচারীদের চলাচল সহজ হয়েছে, কিছু এলাকায় যানবাহনের গতিও বেড়েছে।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, প্রথম ধাপের পাঁচ দিনের অভিযান শেষ হয়েছে। এরপর সাত দিনের নজরদারি চলবে যাতে দখলমুক্ত জায়গা পুনরায় দখল না হয়। এর পর আবার পাঁচ দিনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে। এই ধারাবাহিক অভিযানে নতুন এলাকা দখলমুক্ত করার পাশাপাশি আগের স্পটগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে নজরদারি করা হবে।

ট্রাফিক গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান শেলি বলেন, আমরা এখন ‘বড়লোকের ফুটপাত’ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। অনেক দোকানের গ্রিল, রান্নার সরঞ্জাম, ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি কিংবা বাড়তি অংশ দিয়ে ফুটপাত দখল করে রাখা হয়। এগুলো সরানো গেলে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসবে।

নতুন চ্যালেঞ্জ: আইন প্রয়োগে বাধা

অভিযানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন কার্যকর করতে বাধা। সম্প্রতি বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, কেউ নিজেকে বড় নেতা পরিচয় দিচ্ছে, কেউ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করছে। কখনও সরাসরি ফোনকল, কখনও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা। সব মিলিয়ে আইন প্রয়োগে বাধা তৈরি হচ্ছে। পুলিশ সূত্র বলছে, তর্কে জড়ানো, ভিড় তৈরি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে হুমকি। এমন ঘটনা ঘটছে। কোথাও ফুটপাত দখলকারী প্রতিষ্ঠানকে উসকে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও নিজেই সময়ক্ষেপণের কৌশল নিচ্ছে।

নাগরিকদের দাবিও একটাই, আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। পুলিশি কাজে বাধা দিলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাসিন্দা ও পথচারীর প্রতিক্রিয়া

মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা সামিউল ইসলাম বলেন, ১০ নম্বর থেকে ১৪ নম্বর পর্যন্ত রাস্তায় হাঁটা যেত না। ফুটপাতের দোকানের কারণে মানুষকে রাস্তায় নামতে হতো, দুর্ঘটনার ভয় সবসময় ছিল। এখন অনেকটাই স্বস্তি। তবে যারা অভিযানে বাধা দেয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।

গুলিস্তানের পথচারী নাজিম উদ্দিন বলেন, আগে প্রতিদিন চলাচল করা ছিল দুর্ভোগ। এখন কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু যারা অভিযান ঠেকাতে প্রভাব খাটাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় না আনলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

বনানীর বাসিন্দা তাসমিয়া তানিয়া বলেন, হাঁটতে সবসময়ই সমস্যা হতো। ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় নিরাপদে চলাচল করা যেত না। এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। কিন্তু যারা অভিযানে বাধা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল বলেন, ফুটপাত সাধারণ মানুষের জন্য। এটি দখল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। যারা আইন প্রয়োগে বাধা দেয়, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

গৃহিণী ডলি বলেন, অনেকদিন পর স্বস্তিতে হাঁটা যাচ্ছে। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি বাধা দেয়, তাহলে এই পরিবর্তন টিকবে না। সবার জন্য একই আইন নিশ্চিত করতে হবে।

উচ্ছেদ অভিযানের পরিসংখ্যান

ডিএমপি জানিয়েছে, উচ্ছেদ অভিযানের চতুর্থ দিনে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আর ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কোতোয়ালি, নর্থ সাউথ রোড, বংশাল, নয়াবাজার, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর, পান্থপথ, গ্রিন রোড, সনি স্কয়ার ঈদগাহ্ মাঠ, রাইনখোলা, চিড়িয়াখানা রোড, মালিবাগ, রামপুরা ব্রিজ, টাউন হল, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, বছিলা ও মহাখালী কাঁচাবাজার সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিভিন্ন দোকান থেকে জরিমানা আদায়, মালামাল জব্দ ও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযান সাময়িক নয়, এটি চলমান প্রক্রিয়া। ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই মূল লক্ষ্য। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ট্রাফিক গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. জিয়াউর রহমান বলেন, নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। আইন অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপ-পুলিশ কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, উদ্দেশ্য শুধু শাস্তি নয়, সচেতনতা তৈরি করা। নির্দেশনা না মানলে জেল ও জরিমানার আওতায় আনা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন তৈরি ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব। সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয় ছাড়া নগরাঞ্চলের ফুটপাত সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে নগরবাসীর প্রত্যাশা আইনের প্রয়োগে কোনো বৈষম্য নয়। প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ, আইন সবার জন্য সমান। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই ঠিক করে দেবে রাজধানীর ফুটপাত কতদিন পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights