ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব বাড়ছে?

অনলাইন ডেস্ক

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতকে বেইজিংয়ের জন্য একটি ‘বিরাট কৌশলগত সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। শুক্রবার শেনজেনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে চীন একদিকে যেমন মার্কিন রণকৌশল ও আধুনিক অস্ত্রের সক্ষমতা পরখ করতে পারছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।

প্যাকিং ইউনিভার্সিটি এইচএসবিসি বিজনেস স্কুলের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ঝু ঝাওয়ি বলেন, এই যুদ্ধ চীনের জন্য একটি বিশাল শিক্ষার ক্ষেত্র। চীনের কাছে বিপুল পরিমাণ আধুনিক সমরাস্ত্র থাকলেও দীর্ঘকাল তাদের সেনাবাহিনী সরাসরি কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। ফলে মার্কিন বাহিনীর লড়াই করার পদ্ধতি দেখে চীন নিজের প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার এবং যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি অভিজ্ঞতার অভাব পূরণের সুযোগ পাচ্ছে।

এদিকে, চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার প্রাক্কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দাবি করেছেন যে, খুব শীঘ্রই একটি বড় ধরনের সাফল্য বা ‘বিজয়’ অর্জিত হতে যাচ্ছে। তবে একই সাথে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শনিবার ইরান পুনরায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন নৌ-অবরোধের প্রতিবাদে নেওয়া এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ঝু ঝাওয়ি মনে করেন, এই অস্থিতিশীলতা চীনের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, কারণ এটি বেইজিংকে পুরনো বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন অর্থনৈতিক মেরুকরণ তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত জ্বালানি নিরাপত্তাকে অস্ত্রে পরিণত করেছে এবং দেশগুলোকে পক্ষ নিতে বাধ্য করছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন তার ‘ডুয়াল সার্কুলেশন’ শিল্প মডেলের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাচ্ছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উচ্চ প্রযুক্তির ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য বেইজিংকে এক অনন্য কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সম্প্রতি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ওয়াং ই স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি ‘যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যবর্তী এক সন্ধিক্ষণে’ দাঁড়িয়ে আছে এবং বেইজিং এই অঞ্চলে শান্তি ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চায়।

যদিও ইরান শান্তি আলোচনায় চীনের অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে দেখছে, তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনও কিছুটা কঠোর। মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে উভয় পক্ষ এখনও একমতে পৌঁছাতে পারেনি। এছাড়া হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হামলায় এ পর্যন্ত ২,১০০-এর বেশি লেবানিজ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ২১ লক্ষ মানুষ। ইরান দাবি করেছে যে, যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তিতে অবশ্যই লেবানন পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন এখন এই অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজের নৌবাহিনী ব্যবহারের কথা ভাবছে। চীনা যুদ্ধজাহাজ দিয়ে তেলের ট্যাংকার পাহারা দেওয়ার মাধ্যমে বেইজিং নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন শান্তির জন্য ওয়াশিংটনের চেয়ে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাকে বেশি কার্যকর মনে করছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights