ত্রিপুরা রাজার শতবর্ষী গাড়ি এখনও চলছে কুমিল্লার রাস্তায়

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

ত্রিপুরার রাজকীয় আভিজাত্য আর ব্রিটিশ আমলের কারিগরি দক্ষতার এক সংমিশ্রণ এখনও দেখা যাচ্ছে কুমিল্লার রাজপথে। গাড়িটি ১৯৪০ সালের দিকে নিলামের মাধ্যমে কিনে নিয়েছিলেন কুমিল্লার পরিবহন ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দীন আহমেদ। এরপর থেকে দীর্ঘ ৮৭ বছর ধরে পরম মমতায় গাড়িটিকে আগলে রেখেছে তার পরিবার। পরিবারের দাবি, এটিই ছিল কুমিল্লা শহরের প্রথম কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি।

১৯২৫ সালে তৈরি ‘অস্টিন’ মডেলের একটি গাড়ি ঘিরে এখনও সাধারণ মানুষের কৌতূহল লক্ষণীয়। শতবর্ষ ছুঁইছুঁই প্রাচীন বাহনটি কেবল একটি গাড়ি নয়, যেন এটি ইতিহাসেরই এক চলমান দলিল হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে কুমিল্লা নগরীর শাসনগাছা নিজাম হাউজে গিয়ে দেখা গেছে, গ্যারেজে অন্য প্রাইভেটকার ও ভেসপার সঙ্গে প্রাচীন গাড়িটি এখনও রয়েছে। গাড়ির মালিক সেটিকে একবার হাত দিয়ে হ্যান্ডেল মেরে আবার চাবি ঘুরিয়ে চালিয়ে দেখালেন। তাতে হেডলাইটও জ্বলে উঠলো। চার সিটের এই গাড়িটির বডি শতবছরের পুরাতন। তবে গাড়ির চাকা বদলানো হয়েছে এবং ইঞ্জিনের অল্প কিছু পাটর্সও পরিবর্তন করা হয়েছে। গাড়িটি অকটেনে চলে। বিভিন্ন সময়ে শৌখিন মানুষজন এটি দেখতে আসেন। মালিক ঈদ ও বিভিন্ন পারিবারিক আয়োজনে এটি চালিয়ে শহর ঘুরে আসেন। তখন অনেকে গাড়িটি দেখতে এসে ঘিরে ধরেন।

গাড়িটির বর্তমান দায়িত্বে আছেন ৭২ বছর বয়সের জসীম উদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমার পিতা প্রায় ৮৭ বছর আগে গাড়িটি ত্রিপুরার রাজ পরিবার থেকে কেনেন। আমাদের এরকম প্রাচীন আরও দুইটি গাড়ি ছিল। পার্টস না পাওয়ায় সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় গাড়িটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। তখন গাড়িটির প্রতি আমার মায়া জন্মে। ১৯৬৫ সাল থেকে এটিকে সচল করার চেষ্টা শুরু করি। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে পার্টস এনে গাড়িটি সচল করি। এক ব্যক্তি নতুন গাড়ির চাবি দিয়ে এটি নিতে চেয়েছেন। আরও কয়েকজন বন্ধু এটি কিনতে চেয়েছে, কিন্তু আমি রাজি হইনি। এটার সঙ্গে আমাদের দেশের, শহরের ও পরিবারের ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে।’

সাংস্কৃতিক সংগঠক জামিল আহমেদ খন্দকার জানান, ‘মাস্টার নিজাম উদ্দীন আহমেদ আমার নানা। তিনি গাড়ি ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ত্রিপুরার মহারাজার কাছ থেকে গাড়িটি কিনেছিলেন। তার কেনা গাড়িটি এখন সংরক্ষণ করছেন আমার ছোট মামা জসীম উদ্দীন আহমেদ। শুনেছি, এটি শহরের প্রথম ব্যক্তিগত গাড়ি। আমরা ছোটোবেলায় এই গাড়িতে অনেক চড়েছি। তখন শহরে নামমাত্র কয়েকটি গাড়ি ছিল।’

সামাজিক সংগঠক তারিকুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘১৯৭৫ সালে আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। তখন কান্দিরপাড় মোড়ের সিগন্যালে গাড়িটিকে দেখতাম। সিগন্যালের বক্সে বসে ট্রাফিক পুলিশ হলুদ, লাল ও নীল বাতি জ্বালাতেন। এটি ছিল রাজকীয় টাইপের গাড়ি। এটি আমার জন্মের আগের গাড়ি। তখন শহরে আরেকটি গাড়ি ছিল কুমিল্লা নবাব বাড়ির। এই গাড়ির হর্ন ছিল প্লাস্টিকের, চাপ দিলে পাম্প করে শব্দ হতো।’

কুমিল্লা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা নাজমুল আবেদীন বলেন, প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। গাড়িটি বাসায় গিয়ে দেখে এসেছি। জসীম উদ্দীন আহমেদ পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে গাড়িটি সংরক্ষণ করছেন। এটি পুরো শহরের ঐতিহ্য। গাড়িটি ৮৭ বছর আগে কুমিল্লায় প্রথম হিসেবে মানুষের আকষর্ণের কেন্দ্রে ছিল। এখনও এটি প্রাচীন হিসেবে সেই আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights